✍︎ কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ✍︎
আওয়ামী লীগ নেতাদের সিগারেট কোম্পানির নাম বদলে গিয়েছে এনসিপি নেতার মালিকানায়। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় সেই কোম্পানিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ব্যক্তিগত সফরে যাওয়ার পর এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এতে বেড়িয়ে আসে আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত থেকে ওই কারখানার নাম বদলে এনসিপি নেতার হাতে আসার পেছনের ঘটনা।
কুষ্টিয়া সফরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ‘জেনুইন লিফ টোব্যাকো লিমিটেড’ নামক একটি সিগারেট কারখানায় গিয়েছিলেন। কারখানাটির মালিকপক্ষ হিসেবে বর্তমানে কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতার নাম সামনে আসছে।
ফেসবুকে সোমবার (৫ অক্টোবর) রাতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কুষ্টিয়া সফরের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি কারখানার ভেতরে আছেন। হাস্যোজ্জ্বল মুখে কয়েকজন সঙ্গীকে পাশে ডেকে নিয়ে ছবি তুলছেন।
ভিডিওতে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক এ কে এম জিয়া উদ্দিন রনিসহ কয়েকজনকে পাটওয়ারীর সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা যায়।
ভিডিওর কারখানাটি জেনুইন লিফ টোব্যাকো লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটি এক সময় আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর আবদুস সবুর লিটনের মালিকানাধীন ছিল। তখন এই কারখানা থেকে নকল সিগারেট উৎপাদন করা হতো।
কারখানাটি আগে ‘তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো’ নামে পরিচালিত হতো। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাম রাখা হয় ‘জেনুইন লিফ টোব্যাকো’। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তদন্ত করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘জিএলটি (জেনুইন লিফ টোব্যাকো) সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চসিকের সাবেক কাউন্সিলর আবদুস সবুর লিটনের। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যবসা করছেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আবদুস সবুর লিটন ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, ‘এনসিপি নেতা জিয়া উদ্দিন রনি একসময় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে নেতৃস্থানীয় কেউ ছিলেন না। ৫ আগস্টের পরে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও আব্দুস সবুর লিটনের নির্দেশে রনিকে সবগুলো প্রতিষ্ঠান হস্তান্তর করা হয়। তিনি এখন এগুলোর দেখাশোনা করেন।’
লিটনের ঘনিষ্ঠ ওই ব্যক্তির দাবি, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সংগঠনের জন্য নিয়মিত ফান্ড যায়। বিনিময়ে তারা এই ব্যবসাগুলো রক্ষা করবেন, এমন নিশ্চয়তা দিয়েছেন।’
জিয়া উদ্দিন রনির ফেসবুক আইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি জেনুইন লিফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আছেন। তবে সূত্র বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে রনির সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
এসব বিষয়ে জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘জেনুইন লিফের সঙ্গে আব্দুস সবুল লিটন বা নওফেলের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি পুরোপুরি আমার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। আমি একসময় তারা টোবাকোর ডিজিএম হিসেবে কাজ করতাম। সেটা নিয়ে আমাকে নানাভাবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।’
প্রমাণ হিসেবে তিনি জেনুইন লিফের একটি ট্রেড লাইসেন্স পাঠান। যা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ৩নং বাহিরচর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইস্যুকৃত একটি অফিসিয়াল ট্রেড লাইসেন্স। ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের জন্য ইস্যু করা এই ট্রেড লাইসেন্সটির নম্বর ৭১৯/২০২৬-২০২৭ এবং এটি গত ২৪ জুন তারিখের। লাইসেন্সটিতে মালিক বা প্রতিনিধি হিসেবে এম. কে. এম জিয়া উদ্দিনের নাম উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা অঞ্চলের বাহিরচরের দশ মাইল। লাইসেন্স অনুযায়ী, ব্যবসার ধরন হিসেবে তামাকপণ্য আমদানি, রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা উল্লেখ আছে এবং এই লাইসেন্সের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
জেনুইন লিফ টোবাকো নামে যে কারখানা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী পরিদর্শন করেছেন সেটি আগের ‘তারা টোবাকো’ কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘এটা পুরোপুরি ভুয়া। আমি জাকির হোসেনের কাছ থেকে এটি নিয়েছি।’
এর প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি চুক্তিপত্র পাঠান। ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন এবং ‘জেনুইন লিফ টোবাকো’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম জিয়া উদ্দিনের মধ্যে সম্পাদিত ওই চুক্তিতে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৩ বর্গফুট জায়গা ও তিনটি ফ্যাক্টরি শেড দ্বিতীয় পক্ষকে মোট দশ বছরের ভাড়া দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে জামানত হিসেবে ৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা প্রতি মাসে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা করে পরবর্তী ২০ মাসে ভাড়া হিসেবে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে যেখানে ‘জেনুইন লিফ টোবাকো’র কারখানা এক সময় সেটিই ছিল ‘তারা ইন্টারন্যাশনাল টোবাকো’।
কুষ্টিয়া এনসিপির নেতাকর্মীরা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সফরের সঙ্গে আবদুস সবুর লিটন বা নওফেলের ব্যবসায়িক সম্পর্কের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জেলা এনসিপির নেতারা নিশ্চিত করেছেন, এই সফর দলীয় কর্মসূচির অংশ ছিল না।
গণধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক বলেন, ‘একজন বিতর্কিত ব্যক্তি কুষ্টিয়া এসে দলের কাউকে না জানিয়ে আওয়ামী লীগের আলোচিত একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন। এটা ওই প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগের লোকজনকে পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা কি না, তা তদন্ত করে দেখা দরকার।’
