মাকালুর চূড়ায় পা রাখা প্রথম বাংলাদেশি বাবর আলী

✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎ 

মাউন্ট মাকালু জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে এক নতুন উচ্চতায় পা রাখলেন বাবর আলী। বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম এই শৃঙ্গ জয় করা প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়লেন তিনি।

স্থানীয় সময় শনিবার ভোর পৌনে ৬টার দিকে নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার (২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট) উচ্চতার মাউন্ট মাকালুর শিখরে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান তিনি। এটি বাবরের পঞ্চম আট হাজারি পর্বত বিজয়।

পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত আছে মোট ১৪টি। বাবর আলী এখন পর্যন্ত এর মধ্যে পাঁচটি পর্বত জয় করেছেন, যার মধ্যে অন্তত চারটি জয়ের অনন্য রেকর্ড আর কোনো বাংলাদেশির নেই। ‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজক ছিল পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’। ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান নেপালের ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’-এর স্বত্বাধিকারী মোহন লামসালের বরাতে অভিযানের সফলতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

শিখরে বাবরের সঙ্গে ছিলেন আং কামি শেরপা। বাবরের এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন ভিজুয়াল নিটওয়ারস লিমিটেড, সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন এবং রহমান্স গ্রোসারিজ।

ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স ক্লাবের সভাপতি জানান, ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো খ্যাত এই চূড়া আরোহণের উদ্দেশে বাবর ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষে তিনি ৯ এপ্রিল বিমানে উড়ে যান টুমলিংটার এবং সেখান থেকে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে। এরপর পায়ে চলা শুরু করে ১৮ এপ্রিল পৌঁছান পর্বতের উচ্চতর বেস ক্যাম্পে। এরপর উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ ও পরদিন ক্যাম্প-২-এ ঘুমিয়ে ৭ হাজার মিটার উচ্চতা ছুঁয়ে বেসক্যাম্পে নেমে আসেন।

দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল তিনি পর্বতে চড়ে ক্যাম্প-২-এ এক দিন কাটিয়ে পরদিন নেমে আসেন বেসক্যাম্পে। এরপর শুরু হয় ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা।

আবহাওয়া কিঞ্চিৎ সদয় হওয়ার আভাস পেয়ে বাবর আবার পর্বতে চড়তে শুরু করেন ৩০ এপ্রিল। ওই দিন তিনি সরাসরি উঠে যান ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২-এ। পরদিন ওঠেন ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩-এ। বিকেলটা সেখানেই অপেক্ষা করে মাঝরাতে তিনি বেরিয়ে পড়েন চূড়ার উদ্দেশে। একটানা ১ হাজার ১০০ মিটারের বেশি ভয়ানক চড়াই অতিক্রম করে তিনি ভোরে পৌঁছে যান শিখরে।

ক্যাম্প-২ শনিবার ও রবিবার তিনি বেসক্যাম্পে নেমে আসবেন বলে জানান অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান।

তিনি আরও জানান, পর্বতারোহণে বাবরের পথচলা শুরু ২০১৪ সাল থেকে। ট্রেকিংয়ের জগতে তার হাতেখড়ি হয় ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের নানান পাহাড়ে পথচলার মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তিনি। এই ক্লাবের হয়েই গত ১২ বছর হিমালয়ের নানান শিখরে অভিযান করেছেন তিনি। ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে তিনি মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন ২০১৭ সালে।

২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের অন্যতম দুর্গম ও টেকনিক্যাল চূড়া আমা দাবলাম (২২ হাজার ৩৪৯ ফুট) আরোহণ করেন বাবর। ২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯ হাজার ৩৫ ফুট) ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭ হাজার ৯৪০ ফুট) আরোহণ করেন তিনি। একই অভিযানে দুটি ৮ হাজার মিটার পর্বত আরোহণের কৃতিত্ব নেই আর কোনো বাংলাদেশি পর্বতারোহীর।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১ (২৬ হাজার ৫৪৫ ফুট)। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬ হাজার ৭৮১ ফুট)।

সেটি ছিল প্রথম কোনো বাংলাদেশির কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই ৮ হাজার মিটার উচ্চতার শিখর আরোহণ। মাউন্ট মাকালু চৌদ্দটি ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত শিখর স্পর্শের স্বপ্নের পথে এটি বাবরের পঞ্চম সাফল্য।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *