✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় বিকেলে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের প্রধানমন্ত্রী (প্রিমিয়ার) লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্টহাউস (রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন) থেকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পৌঁছান। সেখানে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয় এবং চীনের সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রিমিয়ার লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে তোপধ্বনি দেওয়া হয় এবং পরে দুই দেশের সরকারপ্রধান সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা) দুই দেশের সরকারপ্রধান ঐতিহাসিক গ্রেট হলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতাবিষয়ক ১৩টি সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, ‘আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে। একই সাথে মানবসম্পদ উন্নয়নে এক পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের রপ্তানি বিষয়েও একটা এমওইউ হয়েছে।’
মাহদী আমিন বলেন, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে সহযোগিতায় দুটো পৃথক এমওইউ হয়েছে। গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চীন সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছে। ট্রেড, এডুকেশন, কালচার, বাণিজ্যসহ সব বিষয়ে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে চায়।
হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও কথা বলেছেন। এ বিষয়ে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছে।
চীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু একটি গল্প নয়, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের নতুন শুভসূচনা।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘চীনের মতো একটি বৃহত্তম দেশ প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে সম্মানিত করেছে, তাতে আমরা মুগ্ধ, সম্মানিত এবং আনন্দিত। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি উপস্থিত ছিলেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল ইকোনমি, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কৃষি খাতের উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। তিনি আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রাসহ গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানান।
শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ জুন দুই দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ায় এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরকারি সফর।
মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী গত সোমবার রাতে প্রথমে যান চীনের দালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেন। তিনি দুই দিনের বিভিন্ন কর্মসূচি শেষ করে গতকাল বুধবার বিকেলে দালিয়ান থেকে হাই স্পিড (বুলেট ট্রেন) ট্রেনে বেইজিং আসেন।
গ্রেট হলে চীন ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে। এই বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের এটি প্রথম চীন সফর। এর আগে ২০০১ সালে তারেক রহমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী হিসেবে চীন সফর করেছিলেন। তিনি ওই সময়ে এই গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীর লালগালিচা সংবর্ধনায়ও উপস্থিত ছিলেন।
