✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে দেশের সাত জেলায় ৫১ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কক্সবাজারে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই জেলায় আহতের সংখ্যাও বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। রোববার দুপুর ২টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতে রোববার দুপুর ২টা পর্যন্ত সারা দেশে ৫১ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন ৩৯ জন। তাদের মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, মৌলভীবাজারে ১২ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জন মারা গেছেন। আহতদের মধ্যে কক্সবাজারের ২৪ জন, চট্টগ্রামের ১২ জন, বান্দরবানের দুজন এবং খাগড়াছড়ির একজন রয়েছেন।
মন্ত্রণালয় বলছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এই ৭ জেলায় গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৫ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫৯ উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৮ হাজার ৪২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, পানিবন্দি দেড় লাখ
চট্টগ্রামের ৭ উপজেলার দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ৬ লাখ। এদিকে, একদিন বিরতি দিয়ে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ফের ডুবেছে। এতে নগরে জনদুর্ভোগ আবারও চরমে উঠেছে।
চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরে ৬ লাখ ৬২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। বন্যায়, পাহাড় ও দেয়াল ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১২ জন।
গত এক সপ্তাহের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৭ উপজেলার মানুষকে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে। টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১২ জন।
চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলার (মহানগরসহ বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, সীতাকুন্ড, মীরসরাই, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও ফটিকছড়ি) মোট ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে জেলার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। গৃহহীন ও প্লাবিত এলাকার মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরই মধ্যে ৫৮০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে ২১ হাজার ৯০০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যা কবলিত এলাকায় এ পর্যন্ত বরাদ্দ হওয়া ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চালের মধ্যে ৭১০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বরাদ্দ করা ৮৫ লাখ টাকা নগদ সহায়তার মধ্যে ৬০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জরুরি খাদ্য সংকট মেটাতে ৩৯ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৫ হাজার ১০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছ।
বর্তমানে জেলা প্রশাসনের কাছে ৪৯০ মেট্রিক টন চাল এবং ২৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ মজুত রয়েছে বলেও জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
এদিকে চট্টগ্রামে আবারও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। টানা ১৩দিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি। একই সাথে টানা বর্ষণে রোববার (১২ জুলাই) নগরের বিভিন্ন সড়কে হাঁটুপানি জমে জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা বিশ্বজিত চৌধুরী বলেন, রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৩৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার। বিকাল ৩টা থেকে আগের ২৪ ঘন্টায় ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। যা অব্যাহত রয়েছে। আকাশ মেঘলা থাকবে। এখন থেকে বর্ষার দিনের মতো আচরণ থাকবে আবহাওয়ার। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি মাঝে মধ্যে ভারি বর্ষণ হতে পারে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে আরও দুই থেকে তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।
সকাল ১০টার দিকে নগরীর চকবাজার, বাকলিয়া, রাহাত্তারপুল কাতালগঞ্জ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কে হাঁটুপানি জমে গেছে। পানি মাড়িয়ে যানবাহন চলাচল করছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অফিসগামী মানুষকে ছাতা ও রেইনকোট পরে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। অনেক এলাকায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংকট দেখা দেয়। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, যানবাহন মিললেও চালকেরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। একটু বৃষ্টি হলেই ৫ টাকার ভাড়া ওঠানামা ১০ টাকা নেয় চালকরা।
গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার জুলাই মাসে এক দিনে গত ৪৩ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। ওই বৃষ্টিতে আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও পতেঙ্গাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে পড়ে। দুই দিন বৃষ্টি কিছুটা কম থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নতুন করে ভারী বর্ষণে আবারও জলাবদ্ধতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বন্যাপ্লাবিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন
কয়েকদিনের টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিতে উদ্ধার তৎপরতা ছাড়াও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও চিকিৎসা সহায়তায় ১১ জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) বিজিবির সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজিবি জানিয়েছে, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই ১১ জেলায় মোট ৯০টি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিজিবি। সেই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এতে বলা হয়, টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসে সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রদান ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বান্দরবানের বন্যাপ্লাবিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ইতোমধ্যে ১১৬ জন পর্যটকসহ ১২২টি পরিবারের ৬ শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও ৪৮ জনকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়েছে বিজিবি। পাশাপাশি বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে উপরে পড়া গাছ ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে তারা। এছাড়াও নাইক্ষ্যংছড়িতে ভূমিক্ষয়ের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া স্টিলের সেতু রক্ষায় জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনসাধারণের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করছে বিজিবি।
