হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৮০০ ছাড়াল

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮০৩। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৯৫ জন ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০৮ জন মারা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৪ জন ও সিলেট বিভাগে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১৩৩ নিশ্চিত হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৮৪১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯০৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এতে করে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ২০ হাজার ৩৫২৮ জনে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি।

বিশ্বজুড়ে হাম ও রুবেলা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তর জেনেভায় নিয়মিত যে প্রাথমিক উপাত্ত জমা হয়, সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে সেই তথ্য সংগ্রহ করে এই চিত্র দেখা গেছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও (সিডিসি) বিশ্বে হাম সংক্রমণের পরিস্থিতি জানাতে জুলাই মাসে তৈরি করা ডব্লিউএইচওর নজরদারি প্রতিবেদনটি ব্যবহার করেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছয় মাসে হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এ সময়ে দেশটিতে হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ২৬ হাজার ৬০৭ জন। যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেন ১৪ হাজার ৫২১ রোগী নিয়ে রয়েছে তৃতীয় স্থানে। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে এরপর রয়েছে মেক্সিকো (১২,৪৯৫), পাকিস্তান (১১,০৩৭), ক্যামেরুন (৯,৬৫৩), কাজাখস্তান (৭,৭৩০), গুয়েতেমালা (৬,৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬,৮১৫) ও সুদান (৫,৭৬৬)।

ডব্লিউএইচও এই ছয় মাসে বিশ্বের ১৬৫ দেশে ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম কিংবা এর উপসর্গের রোগী পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সবচেয়ে বড় হাম সংকট এখন দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।

ডব্লিউএইচও জুন মাসে যে নজরদারি প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানে হাম সংক্রমণে ভারত ছিল শীর্ষে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটিতে রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২৩ হাজার ৩৬১ জন। ওই সময়ে বাংলাদেশ ১৪ হাজার ৭০৪ রোগী নিয়ে ছিল দ্বিতীয় স্থানে। জুলাই মাসের প্রতিবেদন বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার দিকটি নির্দেশ করছে।

দেশে বছরের শুরুতে হঠাৎই শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিছুদিনের মধ্যে রোগীর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৫ মার্চ থেকে হাম সংক্রমণের তথ্য দিচ্ছে। সেই তথ্য অনুসারে, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে হামের সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন আর ১৪ হাজার ৭০৮ জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭০২ জনের। এ ছাড়া ৯৫টি শিশু মারা গেছে, যাদের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত ছিল। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ সময়ে মারা গেছে ৭৯৭ শিশু।

ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে গত মার্চে হঠাৎই রোগীর সংখ্যা ৫ হাজারে পৌঁছায়। পরের মাস এপ্রিলে সংখ্যাটি ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মে মাসে রোগী পাওয়া যায় ১৫ হাজার।

ডব্লিউএইচওর হামের প্রাথমিক তথ্য যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, চূড়ান্ত হিসাবেও তার হেরফের হবে না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে এবার হামের সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা ধরেই নেওয়া যায়। শুধু সংক্রমণের দিক থেকে নয়, বাংলাদেশে সম্ভবত এবার হামে মৃত্যু বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। ডব্লিউএইচওর এ প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *