✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে এ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) চুক্তির লেনদেনসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
২০০৬ সাল থেকে ১৯ বছর স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড এনসিটি পরিচালনা করে আসছিল। গত বছরের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এর পরদিন বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৯ সালে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।
পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগটি পুনরুজ্জীবিত করে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অপারেটর হিসেবে বেছে নেয়। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা এবং চলতি বছরের শুরুতে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ে। পরে বর্তমান সরকার নতুন করে আলোচনা শুরু করে চুক্তি সম্পন্ন করে।
প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটিতে পাঁচটি জেটি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টি এনসিটিতে। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার ৪০ শতাংশের বেশি এই টার্মিনালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এদিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। এ নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছে সংগঠনটি।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির ফলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড ও কনটেইনারের ডুয়েল টাইম কমবে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের লজিস্টিকস ব্যয় কমার পাশাপাশি পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন খাত উপকৃত হবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান অব দ্য বোর্ড অব ডিরেক্টর ইসা কাজিম বলেন, সরকার এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে আমরা ধন্যবাদ জানাই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে এই কনসেশন দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং দেশটির এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে আমাদের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিক অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে। এর ফলে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে আরও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ তৈরি হবে। আমাদের পরিচালনাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেবা দেওয়ার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে চাই।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এই চুক্তি টার্মিনালের পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়াবে, লজিস্টিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে। দেশীয় শিল্পকে সহায়তা এবং আরও দক্ষ বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই অংশীদারত্ব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা করা। নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা সেই লক্ষ্যের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দর পিপিপিতে বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পেরে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আনন্দিত। আমরা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবেশদ্বারে আরও দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা এবং উচ্চতর মান নিশ্চিত করতে চাই। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো এমন একটি বন্দরব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা আমরা যে মাত্রার বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে চাই, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।
এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী বন্দরগুলোর তুলনায় কনটেইনার জাহাজে অবস্থানের সময়, পণ্য খালাসে সময়, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। এসব সক্ষমতা বাড়াতেই আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনালের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করবে। প্রথম ১০ বছরে যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও টার্মিনাল সুবিধা আধুনিকায়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধনি বিনিয়োগ করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন দক্ষতা এনসিসিটিতে যুক্ত করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালিত হয় বলে প্রেস রিলিজে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পাবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ২০ ফুট সমপরিমাণ কনটেইনারের বিপরীতে টার্মিনালের গড় রাজস্বের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব অংশ বা রয়্যালটি পাবে সিপিএ। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
চুক্তিতে বছরে কমপক্ষে ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এ ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউ -তে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানায়, এনসিটি পরিচালনার এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে কোনো ঋণ নিতে হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ফলে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের সঙ্গে এ চুক্তির তুলনা করার সুযোগ নেই।
সংস্থাটি জানায়, হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণে শ্রীলঙ্কা চীনা ঋণ নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ঋণের চাপের মধ্যে ২০১৭ সালে ৯৯ বছরের জন্য বন্দর পরিচালনার অধিকার চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়। অন্যদিকে এনসিটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাতেই থাকছে এবং কনসেশনের মেয়াদ প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর।
চুক্তিতে ট্রাফিক মূল্যায়ন, ঝুঁকি ভাগাভাগি, মুদ্রা বিনিময়জনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিপিএ হস্তক্ষেপের বিধান রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়াটিও দীর্ঘ সময় ধরে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ মন্ত্রিসভা কমিটি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর লেনদেন কাঠামো প্রতিবেদন অনুমোদনের পর ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি দরপত্রের প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। ২৫ জানুয়ারি দরপত্র জমা পড়ে।
এরপর ২৭ জানুয়ারি থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত দরকষাকষি চলে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড ১৬ সেপ্টেম্বর চুক্তিটি অনুমোদন করে। পরে ১ অক্টোবর সিসিইএ অনুমোদন পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে অপারেটর নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলে।
স্থানীয় কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকার বলেছে, এনসিটি-তে বিদ্যমান স্থানীয় জনবলকে ধারাবাহিকভাবে কাজে রাখার ব্যবস্থা থাকবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্ধারিত শর্তে বিদ্যমান কর্মীদের নতুন পরিচালন কাঠামোয় যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
অপারেটরের কার্যক্রম তদারকিতেও সিপিএর ক্ষমতা থাকবে। চুক্তিতে বিভিন্ন মূল কর্মদক্ষতা সূচক (কেপিআই), ধাপে ধাপে কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা এবং আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ও ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো সূচকে টানা তিন মাস লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে নির্ধারিত আর্থিক জরিমানা কার্যকর হবে।
এছাড়া কনটেইনার ও জাহাজ পরিচালনা, রাজস্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে। সিপিএর নিরীক্ষা ও তদারকির অধিকারও বহাল থাকবে।
তবে পুরো কনসেশন চুক্তি প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়েছে সরকার। তাদের ভাষ্য, চুক্তির মেয়াদ, অগ্রিম ফি, বিনিয়োগ, রাজস্ব ভাগাভাগি, ন্যূনতম কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা, কর্মদক্ষতার সূচক, তদারকি ব্যবস্থা ও মালিকানার মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রধান শর্তগুলো প্রকাশ করা হয়েছে।
চুক্তিতে বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য ও পরিচালন কৌশল রয়েছে। এসব তথ্য অবাধে প্রকাশ করলে ভবিষ্যতের ক্রয় ও দরকষাকষির ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। তাই জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি বৈধ গোপনীয়তার আওতায় থাকা তথ্য সুরক্ষিত রাখার নীতি নেওয়া হয়েছে।
