✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি আরও শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপে রূপ নিতে পারে। পরবর্তী সময়ে এটি অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলে আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টির পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি ঘনীভূত হয়ে আজই গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এরপর এটি ধীরে ধীরে গতিপথ পরিবর্তন করে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী বুধবার, ২৮ অক্টোবর, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে এটি ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি অতি প্রবল রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, স্থলভাগে আঘাত হানার পর ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসতে পারে। অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলে আঘাত হানলে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
এদিকে চলতি মাসে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। এর আগে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেও স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি কম হয়েছিল।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বুধবার থেকে পরবর্তী এক-দুই দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে।
গভীর নিম্নচাপের কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার। দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে তা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নচাপের কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সাগর উত্তাল রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এর প্রভাবে আগামী মঙ্গলবার দেশের কয়েকটি স্থানে বৃষ্টি শুরু হতে পারে। পরদিন থেকে পরবর্তী দুই দিন দেশের বড় অংশজুড়ে বৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ দিনে বৃষ্টির প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির প্রবণতা কমতে পারে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড়টি অন্ধ্রপ্রদেশে আঘাত হানতে পারে বলে সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের আবহাওয়াবিজ্ঞানী ড. চিন্ময় কুমার জেনা জানিয়েছেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, তেলেঙ্গানা, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড ও বিহারে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে।
পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ২৬ অক্টোবর সকাল থেকে উত্তাল এবং ২৭ অক্টোবর সকাল থেকে অত্যন্ত উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। ২৮ অক্টোবর সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে সমুদ্রের অবস্থা অতি প্রতিকূল হতে পারে। একই সময়ে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূলের আশপাশের সমুদ্রও উত্তাল থেকে অত্যন্ত উত্তাল হয়ে ২৮ অক্টোবর সকালে অতি প্রতিকূল অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব-মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে সমুদ্রে না যেতে জেলেদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর পশ্চিম-মধ্য, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে এবং ২৭ থেকে ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূলের আশপাশে সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ২৭ ও ২৮ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় এলাকা ও দক্ষিণ ওড়িশার সংলগ্ন অঞ্চলে কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। খড়ের ছাউনিযুক্ত ঘর পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাকা বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের খুঁটি বাঁকা হয়ে যেতে পারে বা উপড়ে পড়তে পারে। গাছের ডাল ভেঙে পড়ার পাশাপাশি বড় গাছও উপড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া ফসল, বাগান ও ফলের বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। সড়ক, রেলপথ, বিদ্যুতের ওভারহেড লাইন ও সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। ছোট নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নোঙর করা নৌযানও ছিঁড়ে যেতে পারে।
ঝড়ের সময় দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। রাস্তায় পানি জমে বড় শহরগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জরুরি বহির্গমন পথেও পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট পথে যানজট ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
