✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ১২তম আসরে ফিক্সিংয়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বিসিবি। ৯০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ক্রিকেটার, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ও ম্যানেজারসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের আপাতত সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
বিসিবির ইনটেগ্রিটি ইউনিটের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে তারা হলেন- ঘরোয়া ক্রিকেটার অমিত মজুমদার, টিম ম্যানেজার মো. লাবলুর রহমান, ফ্র্যাঞ্চাইজি সহ-মালিক মো. তৌহিদুল হক তৌহিদ, আরেক টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী এবং সামিনুর রহমান নামে এক ব্যক্তি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিকেটার অমিত মজুমদার এবং টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী সরাসরি ক্রিকেট ম্যাচের ফলাফল বা পরিস্থিতির ওপর বাজিতে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে, লাবলুর রহমান ও তৌহিদুল হক তৌহিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেওয়া, তথ্য গোপন করা এবং প্রমাণ মুছে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিসিবি জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন বিসিবি এই বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করবে না।
বিসিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী কোড বা বিধিমালার (দ্য ‘কোড’) বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের দায়ে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়, দলের কর্মকর্তা, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক এবং অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টি (বিপিএল টি-টোয়েন্টি) এর ১২তম আসরকে কেন্দ্র করে বিসিবি ইনটেগ্রিটি ইউনিটের (বিসিবিআইইউ) তদন্তের প্রেক্ষিতে এই অভিযোগগুলো আনা হয়েছে। তদন্তে দুর্নীতির চেষ্টা, বেটিং বা জুয়ায় সম্পৃক্ততা, তদন্তে সহযোগিতা না করা এবং তদন্ত কাজে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগগুলো মূলত জুয়া সংক্রান্ত কার্যক্রম, দুর্নীতির প্রস্তাব দেওয়া, বিধিমালার অনুচ্ছেদ ৪.৩ এর অধীনে জারি করা নোটিশ পালনে ব্যর্থতা, তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ গোপন বা মুছে ফেলা এবং নির্ধারিত দুর্নীতি বিরোধী কর্মকর্তার (ড্যাকো) সাথে সহযোগিতা না করার সাথে সম্পর্কিত। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন:
এদিকে, বিপিএলের আগের তিনটি আসরে (৯ম, ১০ম ও ১১তম) ম্যাচ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও বেটিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগের দায়ে সামিনুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি বহিষ্কারাদেশ জারি করেছে বিসিবি। সামিনুর নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি এই বহিষ্কারাদেশ মেনেও নিয়েছেন। বিসিবি ‘এক্সক্লুডড পারসন পলিসি’ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এই বহিষ্কার আদেশ জারি করে।
কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
লাবলুর রহমান (চট্টগ্রাম রয়্যালসের টিম ম্যানেজার)
- ধারা ২.৪.৬—এই ধারা অনুযায়ী, সম্ভাব্য দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্তে ড্যাকোকে যৌক্তিক কারণ ছাড়া সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হওয়া বা অস্বীকৃতি জানানো, যার মধ্যে ৪.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জারি করা ডিমান্ড নোটিশ মানতে ব্যর্থতার বিষয়ও রয়েছে।
- ধারা ২.৪.৭—সম্ভাব্য দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্তে বাধা দেওয়া বা বিলম্ব ঘটানো, যার মধ্যে প্রাসঙ্গিক যোগাযোগ ও তথ্য গোপন, মুছে ফেলা বা ধ্বংস করাও অন্তর্ভুক্ত।
তৌহিদুল হক তাৌহিদ (নোয়াখালী এক্সপ্রেসের সহস্বত্বাধিকারী)
- ধারা ২.৪.৬—ড্যাকো পরিচালিত তদন্তে সহযোগিতা না করা বা ডিমান্ড নোটিশ মানতে ব্যর্থ হওয়া।
- ধারা ২.৪.৭—তদন্তে বাধা দেওয়া, তথ্য গোপন বা ধ্বংস করা।
অমিত মজুমদার (ঘরোয়া ক্রিকেটার)
- ধারা ২.২.১—ক্রিকেট ম্যাচের ফলাফল, অগ্রগতি, পরিচালনা বা অন্য কোনো বিষয়ের ওপর বাজি ধরা, গ্রহণ করা বা তাতে অংশ নেওয়া।
রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী (টিম ম্যানেজার)
- ধারা ২.২.১—ক্রিকেট ম্যাচ-সম্পর্কিত বেটিং কার্যক্রমে অংশ নেওয়া।
অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্র পাওয়ার পর থেকে ১৪ দিনের মধ্যে তাঁদের জবাব দিতে হবে। বিসিবি এ বিষয়ে আপাতত আর কোনো মন্তব্য করবে না।
উপরোক্ত চারজনের পাশাপাশি সংগঠক সামিনুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি বহিষ্কারাদেশ জারি করেছে বিসিবি। নবম, দশম ও ১১তম বিপিএলসহ অন্যবারও দুর্নীতিসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের তদন্তের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের বিপিএল চলাকালেই ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠেছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিসিবির তৎকালীন সভাপতি ফারুক আহমেদ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেন। দীর্ঘ সময় অনুসন্ধানের পর কমিটি বিসিবির কাছে প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার একটি বিশাল তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। সেই রিপোর্ট এরপর তুলে দেওয়া হয় বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে। এরপর যাচাই বাছাই করে ক্রিকেটার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার প্রমাণ পান।
সবশেষ বিপিএলের নিলামে ছিলেন না এনামুল হক বিজয়-মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতসহ আরো বেশ কিছু ক্রিকেটার। মূলত বিপিএলের ২০২৫ মৌসুম আসরে ফিক্সিং সন্দেহের কারণে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে খেলতে দেয়া হয়নি এবারের বিপিএলে। যদিও বিসিবির চূড়ান্ত রিপোর্টে তাদের নাম নেই।
