‘ইরান চুক্তির’ অন্যপ্রান্তে নিভৃতে জ্বলছে ফিলিস্তিন

✍︎ আহমদ ইবসেইস ✍︎

পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ, এমনকি যারা নিয়মিত আন্তর্জাতিক খবর রাখেন, তারাও সম্ভবত সাম ফাহাদ আবু হাইকালের নাম শোনেননি। এই মাসের শুরুতে দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রনের কাছে সাত মাস বয়সী এই ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা। শিশুটির মুখে সরাসরি গুলি করা হয়েছিল।

দখলকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা সম্পর্কে বিশ্ব এখন প্রায় অন্ধকারে। পশ্চিম তীরের সিনজিল গ্রামের মতো এলাকাগুলো এখন কাঁটাতারের খাঁচায় বন্দি। সেখানকার বাসিন্দাদের নিজেদের জমিতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ইসরায়েলি দখলদাররা যেভাবে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও গাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে, নির্যাতন ও হুমকি দিচ্ছে—সেসব খবর সংবাদে খুব কমই আসে।

গাজার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা গত কয়েক মাসে দখল করে নিয়েছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলের মানুষ এখনও না খেয়ে মরছেন। অথচ ইসরায়েলের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা উদ্বেগের’ দীর্ঘ প্রতিবেদনের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে এসব মানবিক বিপর্যয়ের খবর।

শিরোনামে ইরান, আড়ালে গাজা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে জার্মানি—সবখানে পশ্চিমা জনমনে এক ধরনের ধারণা জন্মেছে যে, ফিলিস্তিন ইস্যু এখন ‘পুরোনো খবর’। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা এখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে নিয়েছে। গাজায় নিয়মিত হত্যাযজ্ঞ চললেও তা নিয়ে খবর প্রচার কমে গেছে।

পশ্চিমা বিশ্ব এখন মনে করছে, গাজায় তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতির’ মাধ্যমে ইসরায়েল তার অভিযান শেষ করেছে। তারা ভাবছে, ইসরায়েল এখন কেবল ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষামূলক’ বড় যুদ্ধের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

গাজায় যুদ্ধ কি আসলেই শেষ?

সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে। এখন গণমাধ্যমের শিরোনামে ‘যুদ্ধের সমাপ্তি’ নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। কারণ, এই যুদ্ধ কখনোই প্রাথমিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ছিল না। ইরান কেবল ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে চলমান দীর্ঘ যুদ্ধের একটি অংশ মাত্র।

গত অক্টোবর থেকে গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সেখানে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। চলতি বসন্তকাল পর্যন্ত নথিবদ্ধ দুই হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৯৮১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমানার কাছে যাওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের গুলি করা হয়েছে। গাজায় ভবনগুলো এখনও ধসে পড়ছে। শিশুরা এখনও মরছে। স্নাইপার, ড্রোন আর বুলডোজারগুলো এখনও সেখানে ওত পেতে আছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকেও বিশ্ব ‘যুদ্ধবিরতি’ হিসেবে মেনে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ক্ষুধাকে যখন অস্ত্র বানানো হয়

ফিলিস্তিনিদের ক্ষুধা বা অনাহারও শেষ হয়ে যায়নি। সেখানে ত্রাণ সহায়তাকে এখন আর অধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এটি একটি গাণিতিক হিসাবে পরিণত হয়েছে।

দখলদাররা হিসাব কষছে—ঠিক কতটুকু ত্রাণ ঢুকতে দেওয়া হবে, কত ধীরে তা পৌঁছাবে এবং মানুষকে মানুষের মতো বাঁচতে না দিয়ে আর কতক্ষণ কেবল নিশ্বাস নিতে দেওয়া হবে। ফিলিস্তিনের এই জ্বলন্ত বাস্তবতা এখন ইরান চুক্তির শব্দের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে।

মানচিত্র বদলে সুকৌশলে গণহত্যা

গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের নজর যখন ইরানের দিকে, তখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার আরও এলাকা কবজায় নেওয়ার মানচিত্র তৈরি করে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও তারা তা বাড়িয়ে ৬৪ শতাংশ করে নিয়েছে।

মে মাসের শেষ দিকে এক সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ এলাকা দখল করেছে। তিনি আরও ১০ শতাংশ এলাকা দখলের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই সম্মেলনে উপস্থিত জনতা গাজার শতভাগ দখলের দাবি তুললে নেতানিয়াহু তাদের আশ্বস্ত করেছেন, ইসরায়েল ধাপে ধাপে এগোচ্ছে।

বর্তমানে ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় প্রবেশ করতে পারেন না। গাজার প্রায় সব কৃষিজমি এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে সেখানে এখন সুকৌশলে দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিজের জমিতে যাওয়ার চেষ্টা করলে কৃষকদের গুলি করা হচ্ছে।

সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নিজ ঘরে ফেরার চেষ্টা করলে পরিবারের সদস্যদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে। এমনকি নিজ পাড়ায় ইসরায়েলের আঁকা সীমানা পার হওয়ার কারণে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। এটি আসলে একটি পরিকল্পিত ভূগোলভিত্তিক গণহত্যা।

ইরান ইস্যু যখন ঢাল

ইরান যুদ্ধের খবরকে ব্যবহার করে এসব সত্য ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। গাজার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে ইসরায়েল একে বলছে ‘নিরাপত্তা’। ত্রাণ আটকে দিয়ে বলা হচ্ছে ‘পুরো অঞ্চল হুমকির মুখে’।

ফিলিস্তিনিদের হত্যার পর তাদের ইরানের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রাণ হারানো নিস্পাপ মানুষদের ওপর ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘সহযোগী’ তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শিশুদের মাথায় গুলি করার মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রেও পরে কোনো না কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে।

এভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুটি অন্য একটি গল্পের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনিরা প্রাণ হারালেও এখন আর তা সরাসরি বলা হচ্ছে না। প্রচার করা হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল অথবা ইরান বিপজ্জনক বলে এই মৃত্যু। প্রতিটি ফিলিস্তিনি মরদেহের ওপর এখন জীবনের চেয়েও বড় অজুহাত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লেবানন: গাজা মডেলের পুনরাবৃত্তি

একই পদ্ধতি এখন দক্ষিণ লেবাননেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেখানেও বিষয়টিকে জমি দখলের বদলে হিজবুল্লাহ বা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। লিটানি নদীর দক্ষিণ দিকের বিশাল এলাকা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা এখন জনশূন্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১২ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালানো হচ্ছে।

জমিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ শ্বেত ফসফরাস। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ইসরায়েলি নির্দেশ অমান্য করে নিজ ঘরে ফেরার চেষ্টা করলে তাদের ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গাজা এবং লেবানন—সবখানেই এখন ‘নিজ ঘরে ফেরা’ একটি বড় অপরাধ।

লেবাননের এই ধ্বংসযজ্ঞ ফিলিস্তিন ইস্যুকে আড়াল করতে পারছে না। বরং এটি প্রমাণ করছে যে, ইসরায়েল গাজা থেকে একটি ভয়ংকর কৌশল শিখেছে। কৌশলটি হলো—মানুষকে এলাকা ছাড়তে বলা, তাদের সম্পদ ধ্বংস করা এবং জনশূন্য এলাকাকে ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করা।

ইরান ইস্যু এই পুরো ঘটনাকে কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার গল্পে পরিণত করেছে। এর ফলে প্রতিটি যুদ্ধকে আলাদা এবং প্রতিটি ভুক্তভোগীকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে মনে হচ্ছে। বাস্তুচ্যুতদের ওপর দখলদাররা সবখানে একই ভাষা প্রয়োগ করছে। তারা নিজ এলাকায় থেকে গেলে বলা হচ্ছে ‘মানবঢাল’, পালিয়ে গেলে বলা হচ্ছে ‘এলাকা পরিষ্কার’ আর নিজ ভিটায় ফেরার চেষ্টা করলে তাদের বলা হচ্ছে ‘হুমকি’।

যুদ্ধ যখন শেষ হয় না

ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল অব্যাহত থাকা, গাজায় দুর্ভিক্ষ আর পশ্চিম তীরে চেকপোস্ট ও কাঁটাতারের বেড়াজালে জীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চুক্তিকে ‘যুদ্ধের সমাপ্তি’ হিসেবে ভুল করা উচিত নয়। ফিলিস্তিন ইস্যুকে অন্য কোনো সংঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করলে মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই স্থিতিশীলতা আসবে না।

এই যুদ্ধ বারবার ফিলিস্তিন থেকে শুরু হয়; যেখানে ‘যুদ্ধবিরতি’ মানে নিয়ন্ত্রণের নতুন নাম, যেখানে ‘ক্ষুধা’ একটি রাজনৈতিক অস্ত্র এবং যেখানে সাত মাসের একটি শিশুর মুখে গুলি লাগার ঘটনাকেও ফুটনোট বা পাদটিকা হিসেবে গণ্য করা হয়।

সাম আবু হাইকালকে যখন ফিলিস্তিনের পতাকায় মুড়ে তার বাবার কোলে করে শেষ বিদায় জানানো হচ্ছিল, তখন তার সব নিস্পাপ স্বপ্নও তার সঙ্গেই কবরে গেছে। সামের এই মৃত্যু আসলে প্রকৃত যুদ্ধ, যে যুদ্ধের পুরো গল্পকে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে অন্য কোনো দেশের ক্ষেপণাস্ত্রের খবরের পাশে নিছক পাদটিকা হিসেবে ফেলে রাখা হয়। এই যে ভুলে যাওয়া এবং যাদের ভুলে যাওয়া হচ্ছে—এটাই ইসরায়েলের শেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

আলজাজিরা থেকে অনূদিত

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *