রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি

✍︎ টেকনাফ প্রতিনিধি ✍︎   

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত চলছে। সীমান্তের ওপারে বিমান হামলার পর কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

সম্ভাব্য রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও সীমান্তপথে চোরাচালান ঠেকাতে স্থল ও নৌ টহল বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে টেকনাফ-২ বিজিবির লেফটেন্যান্ট ফুয়াদ রহমানের নেতৃত্বে টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া, বরইতলী ও জাদিমোড়া সীমান্ত এলাকায় বিজিবির বিশেষ টহল পরিচালিত হয়। একই সময়ে নাফ নদীতে নৌ টহল জোরদার করা হয়। এছাড়া টেকনাফ সদর থেকে শাহপরীর দ্বীপ ও হ্নীলা পর্যন্ত পুরো সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বা অবৈধ কর্মকাণ্ড ঘটতে না পারে।

টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’

শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছৈয়দ আলম জানান, বুধবার রাতে কয়েকটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আজ বৃহস্পতিবার সকালেও একটি বিস্ফোরণের শব্দ হয়। পরে সীমান্তের ওপারে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় নাফ নদীতে অনেক জেলেও মাছ ধরতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।

এদিকে, একটি রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা আজম উল্লাহ দাবি করেন, বুথিডং এলাকার চারলাইন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, চলমান হামলার কারণে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ছাড়া সীমান্তে অহেতুক ঘোরাঘুরি না করতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর সীমান্তে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এর আগে বুধবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিট থেকে ৯টা ৪২ মিনিটের মধ্যে চার দফা ভারী মর্টার শেল বিস্ফোরণের শব্দেও প্রকম্পিত হয় পুরো সীমান্ত এলাকা। 

প্রতিবারের মতো এবারও ওপারের যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছে এপারের মানুষের জীবনে। সীমান্তের বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। একই সঙ্গে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মাঝেও নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। 

মিয়ানমারের মংডু উপজেলার হাইরিয়া পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াছ প্রাণ বাঁচাতে ২০১৭ সালে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন। তবে তার অনেক স্বজন এখনো মিয়ানমারেই বসবাস করছেন। দেশটিতে চলমান সংঘাতের খোঁজখবর তিনি নিয়মিত মুঠোফোনে স্বজনদের কাছ থেকে নেন।

স্বজনদের বরাত দিয়ে ইলিয়াছ বলেন, “বৃহস্পতিবার সকালেও মংডু এলাকায় গোলার বিকট শব্দ শোনা গেছে। মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা মংডু ও বুথিডংয়ে তাদের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার প্রভাব আশপাশের কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রামেও পড়েছে। এতে অন্তত দুইজন রোহিঙ্গা হতাহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এছাড়া ২০ থেকে ৩০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে”।

তিনি আরও বলেন, “মংডু এলাকায় এখনো হাজারো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শুধু আমার স্বজনই নন, উখিয়ার ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া অনেক রোহিঙ্গার আত্মীয়স্বজনও এখনো সেখানে আছেন। চলমান যুদ্ধের কারণে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন। কখন কী ঘটে, তা বলা খুবই কঠিন”।

গত দুই দিনে ওই এলাকায় ৩০টির মতো বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে র্দীঘদিন বন্ধ থাকার পর গত দুই দিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু-বুথেডং এলাকার বিস্ফোরণের শব্দে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্তের লোকজনের ঘরবাড়ি। আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভাবছেন।

এ বিষয়ে টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. শাহীন আলম বলেন, “হঠাৎ ভয়াবহ ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠছে। পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদীর ওপারে আগুনের শিখাও দেখা গেছে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আগুনের ঝলক আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। বিস্ফোরণটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আরাকান আর্মির ছোড়া মর্টার শেলের বিস্ফোরণ হতে পারে”।

সবশেষ গেল বছর ২৮ ডিসেম্বরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মর্টার শেল ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কাঁপছিল উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত। র্দীঘদিন বন্ধ থাকার পর আরাকান আর্মি দখলে থাকা রাখাইন রাজ্যে পূর্ন উদ্ধারে আবার হামলা শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার।

প্রসঙ্গত, টানা ১১ মাসের সংঘাতের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্যের মংডু, বুথিডং ও রাথেডং টাউনশিপসহ বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে দেয় আরাকান আর্মি। বর্তমানে এসব এলাকার বিপরীতে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা অবস্থিত। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী নতুন করে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে। একই সময়ে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় আরাকান আর্মির সঙ্গে কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষও অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *