✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসের ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। নতুন প্রস্তাবে সিটি সার্ভিস ও দূরপাল্লার বাস— উভয় ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ভাড়া বাসে ১০ টাকা ও মিনিবাসে ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিআরটিএর বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা ও সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এএসএম আহমেদ খোকন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং নগর বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা হবে। আমরা আমাদের প্রস্তাব বিআরটিএর কাছে দিয়েছি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিআরটিএ এটি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।
বৈঠকে থাকা কমিটির একজন সদস্যও জানান, সিটি সার্ভিস ও দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন ভাড়া আগের মতোই রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিবহন মালিকেরা ভাড়া আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের পক্ষ থেকে কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল। তবে কমিটির আলোচনায় এর চেয়ে কম হারে, অর্থাৎ ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে বৈঠক হয়। এতে পরিবহন মালিক–শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে পরিবহন মালিক–শ্রমিকনেতারা মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে দেখা করে ভাড়া বৃদ্ধির আবেদন জানান।
বিআরটিএর বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানিয়েছে, দূরপাল্লার পথে কিলোমিটারপ্রতি বাসভাড়া ২০ পয়সা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিএ। আর শহরে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ১৮ পয়সা। পরিবহনমালিকদের পক্ষ থেকে আজ রাতের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নতুবা পরিবহন মালিক–শ্রমিকেরা বাড়তি দামে জ্বালানি কেনার কারণে ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারেন। এতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।
পরিবহনমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, আগেরবার শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আমলে নিয়ে ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। এর মধ্যে যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য খরচ বেড়েছে। সেগুলো ধরে ভাড়া বাড়ানোর দরকার ছিল। কিন্তু মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা করে তাঁরা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির হারে বাসের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব প্রজ্ঞাপন জারি করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, টেম্পোসহ অনেক যানবাহন ডিজেলে চলে। এর মধ্যে মালবাহী যানবাহনের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। এমনকি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়াও সরকার ঠিক করে না। এসি বাস ও মালবাহী যানের ভাড়া মালিক–শ্রমিকেরাই নির্ধারণ করেন। অন্যদিকে নন–এসি বাস ও নগর পরিবহনের বাস–মিনিবাসে ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দিলেও তা মানা হয় না। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্য কমার পর ভাড়া কমালেও সেটাও কার্যকর হয় না।
এখন বিআরটিএর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
গত রোববার রাতে সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। প্রতিটি জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। নতুন দর সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
গণপরিবহনের বড় একটি অংশ ডিজেলচালিত। ফলে ডিজেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা বাড়ায় বাস পরিচালনার খরচও বেড়েছে। এই বাড়তি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে জ্বালানি খরচের পাশাপাশি বাস পরিচালনার অন্যান্য ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসের ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা হয়। ২৩ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং ডিটিসিএ এলাকার মিনিবাসে ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। তখন দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ৪০ পয়সা এবং মহানগরের বাসে ৩৫ পয়সা বাড়ানো হয়। পরে ডিজেলের দাম ৫ টাকা কমানো হলে ওই বছরের ৩১ আগস্ট দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২০ পয়সা থেকে কমিয়ে ২ টাকা ১৫ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা কমার পরও ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন দূরপাল্লা ও মহানগরের ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩ পয়সা কমানোর সুপারিশ করেছিল বিআরটিএ।
