✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এবার গাজীপুরের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক পত্রে সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়—১. প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া। ২. অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে বিআরটি বাস কিনে চলাচলের ব্যবস্থা করা। ৩. বিআরটি পথটি যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া। ৪. বিআরটি পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা।
শেষে সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিদ্যমান স্টেশন, বিআরটি লেন আলাদা করার জন্য নির্মাণ করা বিভাজক ভেঙে ফেলতে হবে। উড়ালপথ ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা হবে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর পথটি সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে বিদ্যমান বাসগুলোর দরজা বাঁ দিকে। কিন্তু বিআরটি লেনে স্টেশনগুলো এমনভাবে তৈরি যে বাসের দরজা হবে ডান দিকে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী বিআরটি লেনে দরজা ডান দিকেই থাকে। ডান দিকে দরজাওয়ালা বাস চালু করলে ওই বাসগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দরের বাইরে চলতে পারবে না।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে প্রকল্পটি বাতিল করা। তবে ১৪ বছর গাজীপুরবাসীসহ এই পথের যাতায়াতকারীরা দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা উচিত। তিনি বলেন, বিআরটি বাস চালু হলে গাজীপুরবাসী শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারত। তাঁদের পুনরায় বাস বদল করার দরকার হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়।
সামছুল হক বলেন, প্রকল্পটি বাতিল করে এটিকে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যবহারকারীদের সুবিধা হবে। পাশাপাশি গাজীপুরবাসীর জন্য কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন সেবা চালু করা যেতে পারে। কারণ, এর মধ্যে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে।
গাজীপুর অংশে বিআরটি প্রকল্পের অধিকাংশ পদচারী–সেতুই এখনো ব্যবহারের অনুপযোগীফাইল ছবি
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ।
সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্প চালু হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে বলা হয়েছিল।
মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাশাপাশি এতে অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)।
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। তিন দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে প্রকল্পটি চতুর্থবার সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প খুঁজতে এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিআরটি বাংলাদেশে প্রথম হলেও অনেক দেশেই তা রয়েছে। গ্লোবাল বিআরটি ডেটা নামে একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। এসব বিআরটিতে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। ১৩টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে পাশের দেশ ভারতে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব বিআরটি ব্যবস্থায় প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করে প্রায় পাঁচ লাখ। চীনে বিআরটিতে চলে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে।
বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। কিছু স্থানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে সড়কের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
প্রকল্প বাতিল করার ফলে স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। লিফটসহ অন্যান্য যন্ত্র অন্য কোনো স্থানে ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে সওজের।
এই সড়ক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের মানুষ যাতায়াত করেন। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেনসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানিও হয়েছে।
