চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেফতার

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার সকালে যশোর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি দল।

 মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাত ৩টার দিকে যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘পাঁচ সহযোগীসহ সন্ত্রাসী ইমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার সবাই শুটার।’

ইমন বিদেশে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। চট্টগ্রামে দুই বছর ধরে বেশি কিছু চাঁদাবাজি ও হুমকির ঘটনায় তাঁর নাম আলোচনায় আসে।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চেক পোস্ট বসিয়ে ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিডকে গ্রেফতার করা হয়। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের চারটি ও কোতয়ালি থানা পুলিশের একটি টিম এ অভিযানে ছিল। পরে ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’ 

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরে তার ব্যাপারে কাজ করছিলাম। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোরের ঝুমঝুমপুর থেকে মঙ্গলবার রাতে যশোর পুলিশের সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

ডেবিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। এলাকায় তার ছিল সাধারণ জীবনযাপন। কিন্তু শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর চট্টগ্রামে একের পর এক খুনে নাম জড়ায় তার। পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সাজ্জাদের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’। 

গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার অ্যাকসেস রোডে ডিডিএন নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পরে র‌্যাব-পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে গ্রেফতার করে। ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশি অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। এ সময় তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখায়। 

হামলার দু’দিন আগে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন ডেভিড ইমন। ১১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে কল করে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীর কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘আমার নাম ডেভিড ইমন, আমার সম্পর্কে পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’ ওই হুমকির দুদিন পর নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মরিয়ম হাইটস ভবনে ডিডিএনের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। 

হামলাকারীরা ডিডিএন অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাবপত্র ও কাচের দরজাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় দুর্বৃত্তরা অফিসের ড্রয়ারে থাকা ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি মোবাইল ফোন, একটি ক্যানন প্রিন্টার এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের কাঁধের ব্যাগ নিয়ে যায়। ওই ব্যাগে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট অন্তত ১৫টি মামলার আসামি।

পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাঁদের একজন ইমন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন তাঁর হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলেও তাঁদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *