২০০০ টাকার চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

পবিত্র ঈদুল আজহার তৃতীয় দিনেও রাজধানীর পোস্তা কাঁচা চামড়ার আড়তে চলছে কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা ও সংরক্ষণের ব্যস্ততা। আড়তগুলোতে শ্রমিকরা চামড়ায় লবণ মেখে সংরক্ষণের কাজ করছেন। সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি হওয়ায় লোকসানে পড়েছেন মৌসুমি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা।

সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী বড় আকারের একটি গরুর চামড়ার দাম প্রায় ২ হাজার টাকা এবং মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে পোস্তার আড়তে অনেক বড় চামড়াও ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এর চেয়েও কম দামে চামড়া ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন সংগ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা।

পোস্তা আড়তে ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে চামড়া আনা হচ্ছে। আড়তগুলোতে সারিবদ্ধভাবে চামড়া স্তূপ করে রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা দ্রুত লবণ মেখে চামড়া সংরক্ষণ করছেন। তবে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকলেও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় হতাশ ব্যবসায়ীরা।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহের সময় তারা সরকারি দরকে বিবেচনায় নিয়েই দাম নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু আড়তে এসে সেই চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেকেরও কম দামে। পরিবহন, শ্রমিক ও সংরক্ষণ খরচ বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের বড় অঙ্কের বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি ট্যানারি খাতে নগদ অর্থের সংকটও রয়েছে। ফলে তারা চাহিদামতো দামে চামড়া কিনতে পারছেন না।

একাধিক আড়তদার জানান, ট্যানারিগুলো সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে আড়তগুলোও সীমিত পরিসরে চামড়া কিনছে। এতে বাজারে দাম আরও কমে গেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায় না। ফলে কোরবানির চামড়া থেকে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন সংগ্রাহক, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসা।

তাদের মতে, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ, বাজারে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের সরবরাহ এবং চামড়া সংগ্রহ ও বিপণনে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না হলে কাঁচা চামড়ার বাজারে এ অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে। আর এর খেসারত দিতে হবে মৌসুমি ব্যবসায়ী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ সংগ্রাহকদেরই।

সরকার এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু বাস্তবে সেই দাম কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। শুধু তাই নয় গত বছরের চেয়েও এবার কম দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া।

তবে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে গত বছরের তুলনায় প্রতি পিস গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া এবারও ছাগলের চামড়া কিনতে তেমন আগ্রহ দেখাননি ব্যবসায়ীরা

যশোরের রাজারহাটে ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট ছিলো শনিবার। কাঁকডাকা ভোর থেকেই খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ও ঢাকার গোপালগঞ্জ রাজবাড়ি থেকে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন যানবাহন ভর্তি করে চামড়া নিয়ে এসেছেন। অন্তত ১৫ হাজার চামড়া উঠলেও বাইরের পাইকার ও ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরা না আসায় বেঁচাকেনা জমেনি। 

সরকার নির্ধারিত মূল্য উপেক্ষা করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্ধেকেরও কম দামে চামড়া কিনছেন বলে অভিযোগ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোও। 

সরকার এবার জেলা পর্যায়ে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে মাঝারি গরুর চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ৯৫০ থেকে ১২০০ টাকা এবং বড় গরুর চামড়া ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। 

অথচ যশোরের বাজারে মাঝারি গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ আর বড় সর্ব্বোচ ৮০০ টাকা। সেই অনুযারি সরকারের নির্ধারিতের চেয়ে যশোরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা ফুট। 

চামড়া বিক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি রেট কার্যকরে প্রশাসনের কোনো তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছেন। 

তবে চামড়া ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারিমালিকরা সেই দামে চামড়া কিনতে রাজি নন। 

রাজারহাট হাটের ইজারাদার রাজু আহম্মেদ বলেন, “ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট হওয়াতে সেই পরিমাণ চামড়া উঠেনি। বাইরের আড়তদার বা ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরা না আসাতে বিক্রিও হয়নি ভালো। আশা করছি আগামি হাটে পর্যপ্ত চামড়া আমদানি হবে; পাইকাররাও আসবে। সেই দিন জমজমাট ব্যবসা হবে।” 

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সর্ববৃহৎ এই হাট। তিন শতাধিক আড়তদারের মাধ্যমে ঈদ মৌসুমে লক্ষাধিক চামড়া বিক্রি হয় এই বাজারে। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *