সিকেডি হাসপাতালে চাঁদা দাবি: যুবদল নেতাসহ ৪ জন রিমান্ডে

𓂃✍︎  নাগরিক প্রতিবেদক 𓂃✍︎

রাজধানীর শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিসিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে চাঁদা দাবির ঘটনায় গ্রেফতার সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনকে চার সহযোগীকে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত সোমবার শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

আসামিরা হলেন- মো. ফালান মিয়া (৪২), মো. রুবেল (৪২), মো. সুমন (৩৬) ও মো. লিটন মিয়া (৩৮)।

রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে শুনানি করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরে বাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক মো. ছাব্বির আহমেদ আসামিদের আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে এই মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। মামলার তদন্ত চলমান। ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন, পলাতক আসামি ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের পরিচয় এবং গ্রেফতার, পরিকল্পনাকারী ও উস্কানিদাতাদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য তাদের সাত দিনের রিমান্ডে পাওয়া একান্ত প্রয়োজন।

১১ এপ্রিল সিকেডি হাসপাতালের ওটি ইনচার্জ আবু হানিফ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন মঈনকে এক নম্বর আসামি করে একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন।

মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, মঈন ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে আসছে। দাবিকৃত চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আসামিরা আমাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়-ভীতি ও হুমকি প্রদান করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ এপ্রিল সকালে শেরেবাংলা নগর থানাধীন শ্যামলী ৩ নম্বর রোডে আমার বাসার সামনে এসে দরজা খুলতে বলে।

আমার স্ত্রী দরজা খুলে দিলে আসামি মঈন আমার স্ত্রীকে বলে যে, চাঁদা বাবদ এখনই তাদের ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে আমাকেসহ আমার স্ত্রীর বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিসাধন করার হুমকি দেয়। আমার স্ত্রী আসামিদের চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করাসহ চিল্লাচিল্লি শুরু করে। এ সময় আমি আসামিদের উপস্থিতি টের পেয়ে বাসার অন্য একটি রুমে অবস্থান করি এবং পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কা করে হাসপাতালে অবস্থানরত আমার ছোট ভাই মো. মনির তালুকদারকে দ্রুত বাসায় আসার জন্য ফোন করি।

পরবর্তীতে আমার ভাই বাসায় পৌঁছালে মঈনসহ অজ্ঞাতনামা ৭/৮ জন আসামি ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে আরও লোকজন জড়ো করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন লোক সমবেত করে সিকেডি হাসপাতালের সামনে এসে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তারা হাসপাতালের সামনে অবস্থান নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে, উচ্চস্বরে স্লোগান দেয়, গালাগালি করে এবং পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালায়।

স্বল্প খরচে কিডনি চিকিৎসা ও প্রতিস্থাপনের জন্য অধ্যাপক কামরুলের পরিচিতি রয়েছে। গত শুক্রবার তা সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে যুবদল পরিচয়ে চাঁদা দাবির বিষয়টি গণমাধ্যমে আসে। পর যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নসহ একটি প্রতিনিধি দল রাত দেড়টার দিকে শ্যামলীর ওই হাসপাতালে যান।

মঈন বাহিনীর দেড় বছরে প্রায় ৬০ হাসপাতালে চাঁদাবাজি

সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালেই নয়, এলাকার প্রায় ৬০টি হাসপাতাল, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি এবং এমনকি সরকারি জমিও এই বাহিনীর দখলের মুখে পড়েছে। কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবার পরিচালনার মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করা এই চক্রের কবল থেকে রেহাই পাননি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরাও।

সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় গত দেড় বছর ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘মঈন বাহিনী’। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই বাহিনীর চাঁদাবাজির পরিধি ও ধরণ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। 

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মঈনের নির্দেশে শেরেবাংলা নগর এলাকার প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই চক্রটি তাদের অপরাধের জাল আরও সুসংগঠিত করে। গত নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চাঁদার পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চাঁদা না দিলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা দখলের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই বাহিনীর অত্যাচারে গত দেড় বছর ধরে আমরা অতিষ্ঠ। নির্বাচনের আগে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা নিত। নির্বাচনের পর থেকে একলাফে তা ১ লাখ টাকা করেছে। চাঁদা না দিলে মেরে ফেলাসহ প্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়ার হুমকি দেয়। আর আইনি সহায়তা নিলে আরও খারাপ হবে বলেও ভয় দেখায়একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক

মঈন বাহিনীর কর্মকাণ্ড কেবল চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি শেরেবাংলা এলাকায় জমি দখল, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি দখল এবং মাদক কারবারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এমনকি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি ও কার্যক্রমের ওপরও তাদের হস্তক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে। এলাকার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এই বাহিনীর সদস্যরা মাদকের আসর বসায় এবং মাদক কেনাবেচা করে।

শেরেবাংলা নগর এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে মঈন উদ্দিন কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করছে। কেউ এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও নাজেহাল করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক বলেন, ‘এই বাহিনীর অত্যাচারে গত দেড় বছর ধরে আমরা অতিষ্ঠ। নির্বাচনের আগে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা নিত। নির্বাচনের পর থেকে একলাফে তা ১ লাখ টাকা করেছে। চাঁদা না দিলে মেরে ফেলাসহ প্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়ার হুমকি দেয়। আর আইনি সহায়তা নিলে আরও খারাপ হবে বলেও ভয় দেখায়।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *