জুবায়ের-মুসাদ্দিকের ওপর ছাত্রদলের হামলা

✍︎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ✍︎

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের দুই নেতা এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে। থানায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে ঘটনাস্থলে আসেন জুবায়ের ও মুসাদ্দিক। এ সময় তাদের বেশ কয়েকবার মারধর করা হয়।

এ ছাড়া ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাইয়েদুজ্জামান নূর আলভিও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ।

রাত পৌনে ১০টার দিকে আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়।

আহতরা হলেন– ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের (২২); ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক (২৩), ঢাবি শিক্ষার্থী তানজিম (২১), আলভি (২২) ও এহসান (২৩) এবং ঢাবি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক সিফাত (২০), লিটন (২১), খালিদ (২১)।

ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষের মধ্যে সাংবাদিকসহ ১২ জন আহত হলে তাদের হাসপাতাল নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে জরুরি বিভাগের ৪নং ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা চলছে। আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানিয়েছি।

আহত সাংবাদিকরা হলেন- কালের কণ্ঠের মানজুর হোছাঈন মাহি, আগামীর সময়ের লিটন ইসলাম, ঢাকা ট্রিবিউনের শামসুদ্দৌজা নবাব, ঢাকা মেইলের মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত, নয়া দিগন্তের হারুন ইসলাম, মানবজমিনের আসাদুজ্জামান খান, ডেইলি অবজারভারের নাইমুর রহমান ইমন এবং দেশ রূপান্তরের খালিদ হাসান।

তাদের মধ্যে ঢাকা মেইলের মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত চোখ ও মুখে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়েছে।

ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া আবদুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই পোস্টে ‘প্রধানমন্ত্রী’ তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তবে আবদুল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা পোস্ট দিলেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্ষান্ত হননি। উপরন্তু, ফেসবুকের মাধ্যমে তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হলে নিরাপত্তার স্বার্থে সন্ধ্যা সাতটার দিকে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান তিনি।

জুবায়ের-মুসাদ্দিকের ওপর ছাত্রদলের হামলা

তারসঙ্গে অমর একুশে হল ছাত্র সংসদের জিএস উবায়দুর রহমান হাসিবসহ আরও দুজন ছিলেন। খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা থানা ঘেরাও করে। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায় তারা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান, সংবাদ সংগ্রহের সময় জাগো নিউজের ঢাবি প্রতিনিধি ফেরদৌস ও রাইজিংবিডির সৌরভ ইসলাম ভিডিও ধারণ করতে গেলে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী বাধা প্রদান করেন। এর প্রতিবাদ জানান মানজুর হোছাঈন মাহি।

এ সময় ছাত্রদলের সাবেক সহ-স্কুল বিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান সামিথ মাহিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। মাহি নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিলে সামিথ তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। ফেরদৌসসহ অন্য সাংবাদিকরা মাহিকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের থানার বারান্দা থেকে ধাক্কা দিতে দিতে চত্বরে নিয়ে আসে।

এ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. সাদ্দাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুম বিল্লাহ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ‘শিবির-সাংবাদিক একসাথে চলে না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

কিছুক্ষণ পর অন্যান্য সাংবাদিকরা থানায় উপস্থিত হলে সামিথ এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তা ছিল কেবলই ‘নাটক’। এর কিছুক্ষণ পরই হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুজার গিফারী ইফাত হঠাৎ চিৎকার করে ‘এই ভাইরে মারছে, ভাইরে মারছে’ বলে একটি মব সৃষ্টি করেন। তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তখন সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেন।

আবুজার গিফারীর নেতৃত্বে এই হামলায় অংশ নেন ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম আল নাসের মিশুক, মুহসীন হলের সদস্য সচিব মনসুর রাফি, শহীদুল্লাহ হলের সদস্য সচিব জুনায়েদ আবরার, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা সুলায়মান হোসেন রবি, সাকিব বিশ্বাস ও সাজ্জাদ খান, সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের সদস্য কারিব চৌধুরী ও জাহিন ফেরদৌস জামি, কবি জসীম উদদীন হল ছাত্রদলের নেতা মোহতাসিম বিল্লাহ হিমেল এবং বঙ্গবন্ধু হলের যুগ্ম আহ্বায়ক মমিতুর রহমান পিয়াল ও নেতা হাসানসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। 

এছাড়া ঢাবি ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম অনিক ও ক্রীড়া সম্পাদক সাইফ খানসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতাদের উপস্থিতিতেই এই হামলার ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীতে থানায় গিয়ে হামলার শিকার হন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। একপর্যায়ে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম শাহবাগ থানায় গেলে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাবির শহীদ ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনার পর ওবায়দুর রহমান সামিথ সাংবাদিক মানজুর হোছাঈন মাহিকে ফোন করে বারবার দুঃখ প্রকাশ করেন। অন্য সাংবাদিকরা এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আগে মাহির সঙ্গে কথা বলে আপনাদের সঙ্গে কথা বলবো।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শাহবাগ থানায় ঢুকে মব করেছে এবং পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিয়েছে। এগুলো সবই ফ্যাসিবাদী আচরণের লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ।

রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শেষে তিনি এসব মন্তব্য করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনে ছাত্রদল শাহবাগ থানায় চড়াও হয়েছে কি না সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এস এম ফরহাদ বলেন, ‘একটা ভুয়া ফটোকার্ড, ছাত্রলীগ ছড়ায়। লিগ্যাল এপ্রোচে না গিয়ে, সেটাকে কেন্দ্র করে থানায় গিয়ে মব করা হলো। ডাকসু নেতা মুকাদ্দিস ও জুবায়েরসহ সবার ওপর আক্রমণ করা হলো। এই নগ্ন হামলা, জিডি না নেওয়া, অপেক্ষামাণ রাখা, পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবজার্ভ করা এবং এনজয় করা। এগুলো সবই ফ্যাসিবাদি লক্ষণ।’

রাত পৌনে ৯টার দিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম শাহবাগ থানায় আসেন। এর কিছু পর ছাত্রদলের সভাপতি ও পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম জুবায়ের মারধরের শিকার অন্যদের থানা থেকে বের করে নিয়ে যান। খবর পেয়ে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম শাহবাগ থানার সামনে এলে তাঁকে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ঘিরে ধরেন। এ ঘটনার পর দুই ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

পরে ক্যাম্পাসে সাদিক কায়েম সাংবাদিকদের বলেন, ‘থানায় মব করে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এই হামলা চালিয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’

এদিকে সাংবাদিকদের ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাইমা রহমানকে ঘিরে যে অশ্লীল ফটোকার্ড সোশ্যালমিডিয়াতে ছড়ানো হলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে প্রচলিত প্রসিডিওর মেনে প্রাধ্যক্ষ বরাবর আবেদন করে কিন্তু কে বা কারা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, শাহবাগে আসেন। ইচ্ছাকৃতভাবে তারা ৩ থেকে ৪ জন, ছাত্রদলের হাজার-হাজার নেতাকর্মীর মাঝে আসার পর এমন পরিস্থিতিটি তৈরি হয়। যারা আহত হয়েছে, তাদেরকে নিরাপদে আমরা পার করে দিয়েছি। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মাত্র ২ মাস হয়েছে, এখন এই নতুন সরকারের সূচনা লগ্নে আমরা (ছাত্রদল) অস্থিতিশীল করব, এটি কেউ বিশ্বাস করবে না। আজকের এই অস্থিতিশীলতার মূলে গুপ্ত রাজনীতি (শিবির) এবং আজকে এখানে যেটি হলো সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রোপাগান্ডা।’

সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। বিষয়টা আমি শুনেছি। দেখছি আমি।’

এদিকে রাত পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক ইবনে মোহাম্মদকে দেখতে আসেন ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহাঃ মহিউদ্দিন খান। 

এসময় সাংবাদিকদের ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘একটি ভুয়া স্কিন শার্টের উপর ভিত্তি করে আবদুল্লাহ আল মাহমুদকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, প্রাণের ভয়ে যখন মাহমুদ থানায় যায় তখন তার উপর হামলা চালানো যায়। যখন ডাকসুর প্রতিনিধিরা যায় তখন তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়। মুসাদ্দিক-জুবায়েরসহ ১০ থেকে ১৫ জন হল সংসদ ও ডাকসু প্রতিনিধিসহ সাংবাদিকদের উপর পুলিশের সামনে হামলা চালানো হয়েছে। এটাই কি প্রধানমন্ত্রীর আই হ্যাভ এ প্লান? ছাত্রদলকে বলব, আপনারা আগুন নিয়ে খেলবেন না। আবার যদি ক্ষমতার রাজনীতি ফিরে আনার চেষ্টা করা হয় এবং এই সন্ত্রাসী কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। উপচার্যকে ফোন দিয়েছি, অনতিবিলম্বে এই সন্ত্রাসীদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয়।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *