✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রধান ৩১টি সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু ঋণ, রাজস্ব আদায়, শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সূচকের বাকি ১২টিতে অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এসব সূচকের অগ্রগতিও টেকসই নয়। অবশ্য, পরিস্থিতি অস্বস্থিকর বললেও হতাশ হওয়ার মতো নয় বলে মনে করে সিপিডি।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সিপিডি।
সোমবার এক মিডিয়া সংলাপে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সরকারের প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপ সংক্রান্ত ৯টি খাতের ৩৬২ পর্যবেক্ষণে সিপিডির মূল্যায়নে স্বস্তি ও অস্বস্তির দিকগুলো তুলে ধরা হয়। খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে, শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা। শুধু ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকেই সিপিডির মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।
মূল উপস্থাপনায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু গত ছয় মাসের মূল্যায়নে এ দুই ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি; বরং দুই ক্ষেত্রেই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। টাকা সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থপাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে এসব মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।
সিপিডির মূল্যায়নে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট ও বাজারের অস্থিতিশীলতার যে চ্যালেঞ্জ ছিল, ছয় মাস পরও তা পুরোপুরি কাটেনি।
সুশাসন প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট ও ‘মব কালচার’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে পদায়নের বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও মব সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
১২ সূচকে অগ্রগতি
অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে যে ১২টি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। যার মধ্যে রয়েছে—
১. ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ওপর প্রণোদনা ও তদারকি বাড়ায় প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
২. অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবাসী আয়ের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দ্রুত ক্ষয় কমেছে।
৩. তৈরি পোশাক খাতের হাত ধরে প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ফিরতে শুরু করেছে।
৪. গ্রামীণ ও কৃষি অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংকগুলো থেকে কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
৫. শেষ কয়েক মাসে সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬. দেশে বিদ্যুৎ ও শিল্পে জ্বালানির ঘাটতি মেটাতে প্রয়োজনীয় এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছ।
৭. সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধিতে টিসিবি ও অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে কম দামে খাদ্য পৌঁছানোর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা।
৮. আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে এমএফএস ও কার্ড ভিত্তিক ডিজিটাইজড লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে।
০৯. ব্যাংকিং খাতের অসংগতি দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বাড়ানো এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হয়েছে।
১০. শঙ্কা কাটিয়ে গ্রাহকেরা ফের ব্যাংকে টাকা জমা দিতে শুরু করায় মোট আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
১১. ডলার সাশ্রয়ে বিলাসী পণ্য আমদানিতে তদারকি জোরদার করায় বাণিজ্যিক ঘাটতির গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত।
১২. অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনে বিশেষজ্ঞ কমিটি ও সংস্কার উদ্যোগ কার্যকর করা।
১৯ সূচকে গভীর শঙ্কা
অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এমন ১৯টি খাতের মধ্যে রয়েছে
১. ডলারের অবমূল্যায়ন ও আসল ঋণ পরিশোধের চাপে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ১৪.৫ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৫৫ হাজার ১২৯.৯ টাকায়।
২. নিয়ন্ত্রণহীন খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারনে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাপন মারাত্মক চাপে পড়েছে।
৩. বেসরকারি খাতে ঋণ ও নতুন বিনিয়োগ খরার কারণে উচ্চ সুদের হার এবং আস্থার সংকটে বেসরকারি খাতে নতুন কারখানা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ থমকে গেছে।
৪. এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় আকারের ঘাটতি রয়ে গেছে।
৫. ব্যাংক খাতে পূর্বে জমে থাকা ও নতুন খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ এখনো বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে।
৬. গ্যাস ও বিদ্যুতের আংশিক সংকট এবং আমদানিকৃত কাঁচামালের চড়া দামে উৎপাদন খাত ব্যাহত।
৭. নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার আরও বেড়েছে।
৮. ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার দাম ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়িত হয়ে ১২৩ টাকার কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে।
৯. ক্যাপিটাল মেশিনারিজের আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শিল্পায়ন স্থবির।
১০. রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকার ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
১১. শেয়ারবাজারে আস্থার ঘাটতি, লাগাতার সূচকের পতন এবং লেনদেন তলানিতে নামায় দিশেহারা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
১২. এডিপি বাস্তবায়নে উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ার পুরানো ব্যাধি রয়ে গেছে।
১৩. বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় অনিশ্চয়তায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাড়া আশাব্যঞ্জক নয়।
১৪. রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে টানা চাপ বহাল।
১৫. মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় সাধারণ চাকুরিজীবী ও শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমেছে।
১৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা সত্ত্বেও বেশ কিছু সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে এখনও টাকার তীব্র অভাব।
১৭. পরিচালন ব্যয় কমানোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে।
১৮. লক্ষ্যভুক্ত নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সামাজিক সুরক্ষার সব সুবিধা এখনো শতভাগ পৌঁছেনি।
১৯. জ্বালানি, পরিবহন ও অতিরিক্ত সুদের কারণে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা চালানোর খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সিডিডি মনে নতুন সরকারের নীতিগত উদ্যোগগুলো দৃশ্যমান হতে অন্তত আরও কিছুদিন সময় লাগবে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগ না বাড়লে কেবল প্রবাসী আয় আর রিজার্ভের অগ্রগতির মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানো সম্ভব হবে না।
সিপিডি বিশ্লেষণে মাথাপিছু ঋণ বাড়ার প্রধান ৩টি কারণকে চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে রয়েছে, নতুন করে বাজেট সহায়তা এবং বৈদেশিক ঋণের ছাড় বা সরবরাহ কমে যাওয়ায় নেট বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ ৭৭১.৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪.৩ মিলিয়ন ডালারে নেমে এসেছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার দর কিছুটা অবমূল্যায়িত হয়ে ১২২.৩ টাকা থেকে ১২৩.২ টাকায় পৌঁছেছে। দেশীয় মুদ্রায় ঋণের হিসাব করার সময় টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ঋণের মোট স্থিতি টাকায় বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পূর্বের গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের ঋণের আসলের সাপেক্ষে পুঞ্জীভূত স্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মাথাপিছু ঋণের চাপ বেড়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
