✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
গত জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
এর আগে গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হালনাগাদ চিত্র প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মূলত সুদ যুক্ত হওয়ায় খেলাপি বেড়েছে। খেলাপি কমাতে পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে সামনে খেলাপি কমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে বেড়েছিল ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমলেও পরের প্রান্তিকে তা বেড়ে যায়।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি, যা এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে। সব ব্যাংকের প্রকৃত তথ্য সামনে এলে এই অংক আরও বাড়বে। তাই বিশেষ ছাড় না দিয়ে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল না করে দ্রুত আদায়যোগ্য ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খেলাপি ঋণ কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণই অন্যতম বড় সমস্যা। এটি কমাতে না পারলে ব্যাংকিং খাতকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন।
তিনি বলেন, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ এক্সিট পলিসির আওতায় ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সম্ভাবনাময় কিন্তু সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে এনে আদায়যোগ্য করা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।
আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো শুধু ব্যাংকগুলোর জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে অতীতের অনিয়ম ও ঋণের প্রকৃত মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবর্তনকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা; যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
