তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জেন-জির আচরণগত পরিবর্তন

✍︎ ফারহানা ইফফাত বিন্নী ✍︎ 

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নের ফলে সারাবিশ্ব এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। সারাবিশ্বের তথ্য এখন দ্রুতই মানুষের কাজে পৌঁছে যাচ্ছে। আমরা এখন চাইলে ঘরে বসেই সারা বিশ্বকে মুহূর্তেই জানতে পারছি। প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে দেশ, বদলে যাচ্ছে গতানুগতিকতা, বিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবনধারায়। মানুষের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তি অবদান রাখছে বড়মাত্রায়।

তথ্যপ্রযুক্তির এই উন্নয়নের প্রভাব বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এমন কি বিভিন্ন জেনেরেশনের মধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এরকম প্রভাব জেন-জির মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়।

“জেন-জি” বলতে জেনারেশন জেড (Generation Z) বা প্রজন্ম জেড-কে বোঝায়, যা ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারীদের একটি প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে “ডিজিটাল নেটিভ” বলা হয় কারণ তারা শৈশব থেকেই ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মধ্যে বড় হয়েছে। অন্য কিছু প্রসঙ্গে, “জেন-জি” বলতে একটি পেশাদার ই-স্পোর্টস সংস্থাকেও বোঝাতে পারে, যার পুরো নাম হলো Gen.G Esports। জেন-জি, মিলেনিয়ালদের পরবর্তী এবং জেনারেশন আলফার পূর্ববর্তী প্রজন্ম। এরা স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে পারদর্শী। বিভিন্ন প্রজন্মের ইন্টারনেট ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। জেনারেশন জেড (Generation Z) এবং মিলেনিয়ালরা (Millennials) প্রযুক্তি-নির্ভর এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, যেখানে বুমাররা (Boamers) ঐতিহ্যবাহী সার্চ ইঞ্জিন যেমন গুগল ব্যবহার করে। জেনারেশন জেড তথ্যের জন্য টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, যেখানে বুমাররা সাধারণত গুগলের মতো ঐতিহ্যবাহী সার্চ ইঞ্জিনে অনুসন্ধান করে। 

বাংলাদেশের জেন-জি’ দের চিন্তা ও পেশাগত ভাবনা সম্পর্কে আমরা কমবেশি জানি, বুঝি। আমাদের দেশে ছাত্র-জনতার যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তাতে সামনের সারিতে জেন-জি প্রজন্মই ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তারা নিজেরা সংগঠিত হয়েছে, অন্যদেরও সংগঠিত করেছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা মোটের ওপর পিছিয়ে নেই। এই জেন-জি প্রজন্মই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ পরিবারের ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা (২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত): ১৮-৪৯ বছর বয়সীরা: প্রায় ৯৯% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ১৮-২৯ বছর বয়সীরা: ৯৭% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

বাংলাদেশ: সর্বোচ্চ ব্যবহার: ঢাকা বিভাগে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন রিপোর্ট: বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগের হার নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্যের পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ডিসেম্বর ২০২২ এর হিসাবে দেশের ৩১% জনসংখ্যার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ২০২২ এর শেষে দেশের ৫২.৪% পরিবার সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৪৭.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহর ও গ্রামের পার্থক্য: শহরাঞ্চলে যেখানে ৬৮% এর বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৩৮% এরও কম।

অন্যান্য তথ্য: ইউটিউব এবং টিকটক: ১৮-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে, ২১% টিকটক দিয়ে তথ্যমূলক অনুসন্ধান শুরু করে এবং ৫% ইউটিউব থেকে শুরু করে। একাধিক চ্যানেল ব্যবহার: জেন জেড এবং মিলেনিয়ালস তাদের ক্রয় যাত্রায় একাধিক চ্যানেল ব্যবহার করার সম্ভাবনা বুমারদের তুলনায় বেশি। গুগল ব্যবহার: জেন জেড গড়ে গুগলের চেয়ে কম ব্যবহার করে থাকে, যখন বুমাররা বেশি ব্যবহার করে থাকে।

এখন জেন-জি প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের সর্বোচ্চ বয়স ২৭ বছর, আর সর্বনিম্ন বয়স ১২। এরা জন্মের পরপরই নানা ধরনের গ্যাজেটের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এদের আমরা ‘প্রযুক্তি প্রজন্ম’বলতে পারি।

জেন-জি প্রজন্মের যাঁদের বয়স ২৭, তাঁরা ইতিমধ্যে লেখাপড়া শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন। জেন-জি প্রজন্মের জন্য বড় আঘাত হয়ে আসে করোনা মহামারি। ২০২০ সালে পৃথিবীব্যাপী যখন এই ভাইরাস আতঙ্ক ছড়ানো শুরু করে, জেন-জি প্রজন্মের বড়োদের বয়স তখন ২৩ বছর। কেউ স্নাতক শেষ করেছেন। কেউ করতে পারেননি। কেউ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু কাজ করতে হয়েছে ঘর থেকে।

চাকরির শুরুতেই ‘হোম অফিস’ করতে বাধ্য হওয়ায় অনেকেরই যোগাযোগদক্ষতায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর যাঁরা স্নাতক শেষ করতে পারেননি, তাঁদের বারবার শুনতে হয়েছে পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ার দুঃসংবাদ। অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। শুনতে হয়েছে ‘অটো পাসে’র বদনাম। অনেকেই কম্পিউটার-মুঠোফোন নিয়ে দিনরাত পড়ে থেকেছেন। পরিবারের সঙ্গে অনেকেরই ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানদের নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা দুনিয়াতেই জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে এমন চিত্র দেখা গেছে।

জেন-জির সঙ্গে এর আগের প্রজন্ম মিলেনিয়ালের (১৯৮১-১৯৯৬) চিন্তাভাবনায় ব্যবধান অনেক বেশি। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্যই এই ব্যবধান তৈরি করেছে। মিলেনিয়াল প্রজন্ম মনে করে, জেন-জিদের মধ্যে উদ্দীপনার অভাব আছে। এরা পরিশ্রম ছাড়াই সাফল্য পেতে চায়। যদিও অভিযোগটি নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ আছে।

জেন-জি প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষ ধরাবাঁধা ৯টা-৫টার চাকরি পছন্দ করে না। স্যুট-টাই পরে অফিসে গিয়ে আরামকেদারায় বসা এঁদের কাছে নেই। তাঁরা দিনের যেকোনো সময়ে কাজ করতে আগ্রহী। দীর্ঘ সময় ধরে অফিসে থাকাও তাঁদের বিশেষ পছন্দের নয়। ক্যারিয়ারের উন্নতির চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনে সুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে ইচ্ছুক এই প্রজন্মের অনেকেই।

চাকরির চেয়ে ব্যবসা করতেই জেন-জি বেশি আগ্রহী। তাঁরা মনে করেন, ব্যবসা করার যোগ্যতা তাঁদের আছে। তাঁদের মতে, এই ডিজিটাল যুগে ব্যবসাবিষয়ক তথ্যাদি ইন্টারনেটেই পাওয়া যায়। অবশ্য তাঁরা যে চাকরির প্রতি পুরোপুরি অনাগ্রহী, তা-ও পুরোপুরি বলা যাচ্ছে না। জেন-জি প্রজন্মের একটি অংশ মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই বেশ আয় করা যায়। একটি স্মার্টফোন থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব। পেশা বলতে আমরা এতকাল যা বুঝে এসেছি, সে ধারণা থেকে জেন-জি প্রজন্মের ধারণা বেশ আলাদা। এঁদের অনেকেই ফ্রিল্যান্সিং করেন এবং বাকি জীবনে সেটাই করে যেতে চান। প্রথাগত অফিসগুলোতে যে ‘জি-স্যার, ইয়েস স্যার, স্যার স্যার’ব্যাপার থাকে, জেন-জি প্রজন্ম এই ব্যাপারটিকে একদম পছন্দ করেন না। জ্যেষ্ঠ সহকর্মী হওয়ায় তাঁকে যে আলাদা খাতির করতে হবে, এটা তাঁরা মানে না। অফিসের নির্দিষ্ট আউটফিট অর্থাৎ পোশাক পরার ক্ষেত্রেও তাঁদের আপত্তি আছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন বলছে, জেন-জি বসরা অফিস আর বাসার মধ্যে তেমন পার্থক্য রাখেন না। প্রায়ই ঘরে পরার বা জিমে যাওয়ার কাপড় ও জুতা পরে অফিসে চলে আসেন।

বাংলাদেশের জেন-জি’ দের চিন্তা ও পেশাগত ভাবনা সম্পর্কে আমরা কমবেশি জানি, বুঝি। আমাদের দেশে ছাত্র-জনতার যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তাতে সামনের সারিতে জেন-জি প্রজন্মই ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তারা নিজেরা সংগঠিত হয়েছে, অন্যদেরও সংগঠিত করেছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা মোটের ওপর পিছিয়ে নেই। এই জেন-জি প্রজন্মই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জেন-জির নেতিবাচক প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দেখা দেয়, যা কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনে বাধা সৃষ্টি করে। সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক চাপ বাড়ায় এবং বাস্তব জীবনে সম্পর্কগুলো দুর্বল করে তোলে।

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য

 শারীরিক স্বাস্থ্য: প্রযুক্তির উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ হয়, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

মানসিক স্বাস্থ্য: সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়ায়।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগে প্রভাব

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার শারীরিক এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে।

দুর্বল সম্পর্ক: ভার্চুয়াল যোগাযোগ বাস্তব জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আবেগ-অনুভূতির (যেমন স্নেহ ও মমতা) ক্ষতি করে।

কাজের ক্ষেত্রে প্রভাব

কাজের প্রতি মনোযোগের অভাব: প্রযুক্তি-নির্ভরতার কারণে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে, যা কর্মজীবনে একটি বাধা সৃষ্টি করে।

প্রযুক্তিগত আসক্তি: অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যে প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি দেখা যায়, যা তাদের উৎপাদনশীলতা এবং লক্ষ্য অর্জনে বাধা দেয়।

অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব

ভুল তথ্যের প্রভাব: ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি রয়েছে, যার উপর জেন-জি প্রজন্ম বেশি নির্ভর করে এবং এটি তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করতে পারে।

লেখিকা: বিভাগীয় প্রধান, দর্শন বিভাগ, হাবীবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *