ঢাকায় ভারতের ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগ

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

বিগত কয়েক মাসের অস্থিরতা কাটিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা ও দিল্লি। উভয় দেশই এখন পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম শুরুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সব ক্যাটাগরির ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছে। অন্যদিকে, ভারত আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

গত ৭-৮ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান যখন ভারত সফর করেন, তখন ভিসা স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি ছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান দাবি। বর্তমানে ভারতে বাংলাদেশের সব ভিসা সেন্টার (নয়াদিল্লিতে অবস্থিত হাই কমিশন এবং কলকাতা, আগরতলা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের কনস্যুলার বিভাগ) সম্পূর্ণরূপে কার্যকর রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা দিল্লির কাছে বিষয়টি পারস্পরিক ভিত্তিতে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কিছু সেন্টারে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল, যা ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় চালু করা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা সফর করেছিল। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রীও সেই প্রতিনিধিদলের অংশ ছিলেন।

উভয় পক্ষের ভিসা প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ঢাকা ও দিল্লি অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি সংযোগের মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে। কূটনৈতিক সূত্র বরাতি দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও বাড়তে পারে। এ ছাড়া সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করেছে।

নয়াদিল্লির সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত বছর নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা সেবা ব্যাহত হলেও তা কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। বিশেষ করে চিকিৎসা বা পারিবারিক জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে আবেদনগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম ধাপে ধাপে স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া চলছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা সেবা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে মেডিকেল এবং ফ্যামিলি বা পারিবারিক ভিসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর ভিসা সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর বিষয়টি আরও দ্রুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হাই কমিশনের তথ্যমতে, গত ২০ ফেব্রুয়ারির পর থেকে দুই মাসে ভারতীয় নাগরিকদের ১৩ হাজারেরও বেশি ভিসা ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায়িক, পর্যটন, মেডিকেল এবং পারিবারিক সাক্ষাতের মতো বিভিন্ন ক্যাটাগরি রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসায়িক ও পর্যটন ভিসার জন্য আবেদনকারীরা সাধারণত নয়াদিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ে আবেদন করেন, অন্যদিকে পারিবারিক কারণে অনেকেই কলকাতা ও আগরতলার কনস্যুলার বিভাগে আবেদন করছেন।

ভারতের মোট বিদেশি পর্যটকের ২০ শতাংশেরও বেশি আসে বাংলাদেশ থেকে। চিকিৎসা, ব্যবসা এবং বন্ধু বা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টিই এর বড় অংশ, যার একটি বড় গন্তব্য হলো পশ্চিমবঙ্গ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারত ভ্রমণ করা বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ২১ লাখ ২০ হাজার। ২০২৪ সালে তা সামান্য কমে ১৭ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভিসা বিধিনিষেধের কারণে এই সংখ্যা কমে ৪ লাখ ৭০ হাজারে নেমে আসে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভারতীয় মিশনের বাইরে বিক্ষোভের ঘটনার পর ভিসা কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে অবনতি হয়। এরপর চলতি বছরের ফেব্রয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্কোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।

একটি সূত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলছে, যখন ভিসার বিষয়টি স্বাভাবিক হবে তখন ভারত ও বাংলাদেশ অন্যান্য বিষয়— অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে। এছাড়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও হতে পারে বলে জানিয়ছে সূত্রগুলো।

ভারত সরকার জানিয়েছে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তারা ভিসা সেবা সীমিত করে দেয়। কিন্তু কখনো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। ওই সময় শুধুমাত্র পারিবারিক ও চিকিৎসার মতো জরুরি ভিসাগুলো দেওয়া হয়।

এখন ভিসা সেবা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণভাবে চালু করতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশে ভারতের নতুন রাষ্টদূত হিসেবে দায়িত্ব নেবেন দীনেশ ত্রিবেদী। ধারণা করা হচ্ছে ভারত দ্রুত সময়ে সম্পূর্ণ ভিসা সেবা চালু করে দেবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *