✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
ঢাকার তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রিতে থাকলেও অনুভূত হচ্ছে ৪২ ডিগ্রির বেশি। স্বাধীনতার আগে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল। সেদিন তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এরপর দীর্ঘ ৫৪ বছর পর ২০১৪ সালের ১৪ ও ২৩ এপ্রিল ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। একই তাপমাত্রা আবার রেকর্ড হয় ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল।
এবার তাপমাত্রা সেই সীমায় না পৌঁছালেও গরম অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এখন শুধু থার্মোমিটারের পারদ দিয়ে গরম বোঝার সুযোগ নেই। প্রকৃত তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা মিলে শরীরে যে তাপ অনুভূত হয়, সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একে বলা হয় ‘হিট ইনডেক্স’ বা তাপ সূচক। আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। দেহের তাপ বের হতে না পেরে অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার বেলা ২টায় ঢাকার প্রকৃত তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সন্ধ্যা ৭টায় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি। কিন্তু ‘রিয়েল ফিল’ বা অনুভূত তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রিরও বেশি ছিল। অর্থাৎ শরীর বাস্তবে যে গরম অনুভব করছে, তা রেকর্ড করা তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
এপ্রিলজুড়ে আগের দুই বছরের মতো দীর্ঘস্থায়ী ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি। বরং বৃষ্টি বেশি হয়েছে। তবে তাতে কমেনি ভ্যাপসা গরম। আবহাওয়াবিদদের মতে, এবার গরমের প্রধান কারণ রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। গতকাল ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬ ডিগ্রি বেশি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এ সময় ঢাকায় ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাতের তাপমাত্রা না কমায় দিনের গরম তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় অস্বস্তি আরও বেড়েছে।
সহকারী আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা বলেন, এখন কালবৈশাখীর মৌসুম। বিকেল বা সন্ধ্যায় বৃষ্টি হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমছে। কিন্তু দ্রুত মেঘ কেটে গিয়ে রোদ উঠছে। ফলে দিনের বেলায় আবার গরম বাড়ছে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, দখিনা বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শরীর বেশি ঘামছে। সেই ঘাম শুকাতে না পারায় গরম আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও ভ্যাপসা গরম মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২১ সালে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও জার্মান রেড ক্রসের যৌথ গবেষণায় ঢাকার ২৫টি এলাকাকে ‘চরম উত্তপ্ত অঞ্চল’ বা হিট আইল্যান্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে বাড্ডা, গুলশান, মিরপুর, গাবতলী, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, মহাখালী, উত্তরা ও তেজকুনিপাড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার উষ্ণতম স্থানের সঙ্গে শহরের বাইরের অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকার তাপমাত্রার পার্থক্য দিনে প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়। যেমন, সাভার বা সিঙ্গাইরে যখন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি, তখন ফার্মগেট বা তেজগাঁও এলাকায় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে হাজার হাজার এসি থেকে নির্গত তাপ একসঙ্গে বাতাসকে গরম করছে। যারা এসি ছাড়া থাকেন, তারা আরও বেশি গরম অনুভব করেন। সবুজায়ন কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। গাছ ও জলাধার না থাকায় শহর প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে।
