এডিস মশা শনাক্তে ‘স্মার্ট ফাঁদ’ তৈরি করল ঢাবি

✍︎ ঢাবি প্রতিনিধি ✍︎

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি আগেভাগে শনাক্ত করতে স্বয়ংক্রিয় ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত ‘স্মার্ট ফাঁদ’ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল গবেষক।

‘MAST-CloudNet’ নামের এই যন্ত্রটি বিশেষ শব্দের মাধ্যমে মশা আকৃষ্ট করে, ক্যামেরায় ছবি তোলে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মশার প্রজাতি শনাক্ত ও সংখ্যা গণনা করে। এর মাধ্যমে কোনো এলাকায় এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে কি না, তা দূর থেকেই জানা সম্ভব হবে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপের গবেষকরা যৌথভাবে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন।

তাদের গবেষণাপত্রটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement-এ প্রকাশিত হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওড়ার সময় স্ত্রী এডিস মশার ডানা থেকে তৈরি হওয়া শব্দের অনুকরণে ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে ফাঁদটি। এতে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ এডিস মশা কাছে এলে ভেতরের ফ্যান সেগুলোকে টেনে নিয়ে হলুদ আঠালো কাগজে আটকে ফেলে। এরপর ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে এআই মডেল ছবি বিশ্লেষণ করে মশার প্রজাতি শনাক্ত করে এবং সংখ্যা গণনা করে। এসব তথ্য ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়।

গবেষকদের মতে, পুরুষ মশা স্ত্রী মশার আগেই পূর্ণবয়স্ক হয় এবং প্রজননস্থলের কাছাকাছি থাকে। ফলে কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে নতুন করে মশার বংশবিস্তার হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এটি ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিরূপণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।

গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় শব্দযুক্ত ফাঁদটি একই ধরনের শব্দহীন ফাঁদের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় টানা তিন দিন যন্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহল থাকলেও ফাঁদটি সচল ছিল। তিন দিনে এতে ৪৯টি এডিস মশা ধরা পড়ে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এর তুলনায় মশা জরিপে ব্যবহৃত সিডিসি লাইট ট্র্যাপের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা।

তারা জানিয়েছেন, একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেকগুলো ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব। বিদ্যুৎ চলে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে ফাঁদটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চালু রাখা যায়।

তবে বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাইয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি বাড়ছে, তার একটি আগাম মানচিত্র তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে যন্ত্রটিকে সৌরশক্তিতে চালানো, ওয়াই-ফাই ছাড়াই দূরত্বে তথ্য পাঠাতে দীর্ঘ পরিসরের রেডিও তরঙ্গভিত্তিক সংযোগ যুক্ত করা এবং রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

গবেষক দলে রয়েছেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, এ এম এম মুনিফ খান, ফাহাদ আরেফিন ও আসিফ রহমান দীপ্ত এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুঈদ, প্রভাষক আতিয়া সানজিদা শর্মী, মো. সিয়াম সরকার ও নিলয় হাওলাদার। এ ছাড়া গবেষক দলে রয়েছেন আতিক বিন জাকির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিলের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে, তা জানা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।’

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *