শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা আবারও হবে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎ 

ব্যক্তিগত মন্তব্যের জন্য জাতীয় সংসদে দুঃখপ্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সেই সঙ্গে পুনরায় পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলের ওপর জনমত যাচাই পর্বে সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে এসব কথা জানান।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলি নাই। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে, সিম্পলি দুঃখপ্রকাশ করছি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘শফিকুল ইসলাম মাসুদ তাঁর বক্তব্যে পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরা সংসদের দিকে আসতেছেন—এটা বলেছেন। এ ব্যাপারে আমরা অনেক পর্যালোচনা করে দেখেছি। গতকালকে (সোমবার) যে পদার্থ বিজ্ঞানের পরীক্ষা হয়েছে, হিসাব বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা হয়েছে। এ পরীক্ষার সময় বৃষ্টি ছিল, অনেকেই ভিজেছে এবং অনেকেই পরীক্ষা সঠিকভাবে দিতে পারেনি, এমন অভিযোগ এসেছে। আমরা যদিও সব সময় পর্যবেক্ষণের মধ্যে ছিলাম, তারপরও শিক্ষার্থীদের দাবি এসেছে এ পরীক্ষাটি নিয়ে।’

এহছানুল হক বলেন, ‘ইতিমধ্যে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলার পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছি, আমাদের পুনরায় পরীক্ষা নিতেই হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা ভেবে-চিন্তে দেখেছি চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা যখন নিতে যাব—পদার্থ বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা, সে সময় আমরা এ পরীক্ষাটি পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব ইনশাআল্লাহ।’

সম্পূরক প্রশ্নে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। গত তিন-চার দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহর পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। শিক্ষার্থীরা অনুরোধ করেছিল পরীক্ষা পেছানোর জন্য। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। যে কারণে আজ ঢাকায় আন্দোলন হচ্ছে। এইচএসসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এক-দুদিন পিছিয়ে দিতে কী সমস্যা ছিল, তা তিনি জানতে চান।

জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সারা দেশে একযোগে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় ২ হাজার ৭০০টি কেন্দ্র রয়েছে এবং ৬৪টি জেলায় একই সময়ে পরীক্ষা শুরু হয়। চট্টগ্রামে বন্যার পর পর্যায়ক্রমে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং এরপর পুরো চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘৬৪ জেলার এসপি, আটটি বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তারা জানিয়েছিল যে, আর বৃষ্টি হবে না। বিকেল ৫টা পর্যন্ত আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট সবাই বলেছেন যে, আবহাওয়া ভালো থাকবে, সে কারণেই আমরা পরীক্ষা বহাল রেখেছি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের মাঠ পানিতে ভরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা মেয়র, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিই পরীক্ষাকেন্দ্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে। পরে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে ওই স্কুলের পাঁচতলা ভবনে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। আমরা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি।’

আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা জানিয়েছেন, কোথাও পরীক্ষা গ্রহণে কোনো ধরনের দুর্যোগজনিত সমস্যা হয়নি। শুধু কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে এ ঘটনা ঘটেছে।’

এহছানুল হক বলেন, যে মেয়েটির কাপড় ভিজে গিয়েছিল, তার বাড়ি থেকে কাপড় এনে দেওয়া হয়েছে। তাকে এক ঘণ্টা পরে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষার সময়ও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসন—জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশ প্রশাসন—তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব কি না। প্রয়োজনে তারা পরীক্ষা স্থগিতও করতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বারবার তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা বলেছেন, ‘‘না স্যার, আমরা ঠিকমতো পরীক্ষা নিচ্ছি।’’ আপনারাও দেখেছেন, কোথায় কোথায় বৃষ্টির পানি ছিল। সেগুলো আমরা সবাই লক্ষ করেছি। কোমলমতি সন্তানদের জন্য আমাদেরও মায়া রয়েছে। সে কারণেই আমরা সব সময় পরিস্থিতি মনিটরিং করি।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।

যশোর-৪ আসনের গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশে কওমি মাদ্রাসা রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। এসব মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ।

মন্ত্রী আরও জানান, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি, এতে শিক্ষার্থী ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ২৪৬ জন, কিন্ডারগার্টেন ৩২ হাজার ৬৬৩টি, এতে শিক্ষার্থী ৬০ লাখ ৮৯ হাজার ৩১৩ জন। সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৯৫টি, সেখানে শিক্ষার্থী প্রায় ১৫ লাখ। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে ৭ হাজার ৫২৮টি, এতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

বর্ষার মধ্যে সারা দেশে এখন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্য সব বোর্ডের পরীক্ষা ঘোষিত সময়সূচি ধরে চলছে।

এর মধ্যে গতকাল প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থীরা। সেদিন বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান (প্রথম পত্র), মানবিক বিভাগের যুক্তিবিদ্যা (প্রথম পত্র) এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান (প্রথম পত্র) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তার মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে দুটি ভুল ছিল বলে শিক্ষার্থীরা জানান।

সংসদ ভবনের সামনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে সরিয়ে দিল পুলিশ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংসদ ভবনের সামনে থেকে লাঠিপেটা ও ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং তাদের দেওয়া ব্যারিকেড সরিয়ে দেয়। এর আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন বটতলার গেটে অবস্থান নেন পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় আসাদগেট-খামারবাড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে সেখানে সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

এদিকে আন্দোলনের মধ্যেই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. তানভীর মিয়া জানান, এইচএসসি পরীক্ষা, প্রশ্নে ভুল এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়।

এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নে ত্রুটির বিষয়ে ৪ শিক্ষককে শোকজ

উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ এর পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে গুরুতর ত্রুটি ও অসংগতির ঘটনায় প্রশ্নপত্র পরিশোধনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট।

মঙ্গলবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন স্বাক্ষরিত পৃথক নোটিশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

নোটিশে বলা হয়, গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ২০২৬ সালের সিলেবাস অনুযায়ী প্রণীত প্রশ্নপত্রের সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে মারাত্মক ত্রুটি ও অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রশ্নপত্রে এমন ভুল থাকায় পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা চরম মানসিক চাপের মুখে পড়ে।

এতে আরও বলা হয়, একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক ও প্রশ্নপত্র পরিশোধক হিসেবে এ ধরনের ত্রুটি থেকে যাওয়া চরম দায়িত্বহীনতা এবং পেশাগত কর্তব্যে অবহেলার শামিল। একই সঙ্গে এ ঘটনায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

প্রশ্নপত্র পরিশোধনে এমন গুরুতর ত্রুটি ও অসংগতির জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা নোটিশ পাওয়ার তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।

যাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে তারা হলেন—শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক কাজী জুনায়েদ আল আমিন, এমসি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোছাদ্দেক হোসেন খান এবং সিলেট সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

উল্লেখ্য, বন্যা ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১৩ জুলাই এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নপত্রের দুটি সৃজনশীল প্রশ্নে অসংগতি ধরা পড়লে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *