✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
নিখোঁজের এক দিন পর ঢাকার তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ।
গতকাল বুধবার বিকেলে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। তিনি অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন।
নৌ পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা জানতে পেরেছেন, তাহসিফ গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার পর কয়েকজনের সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়েছিল। তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারও তাঁর খোঁজ পাচ্ছিল না।
মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে খবর পাওয়া যায় যে রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান নৌ পুলিশের সদস্যরা।
তাহসিফ সপরিবার উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। গত মঙ্গলবার তিনি নিখোঁজ হন। তাঁর বাবার নাম কে এম এনায়েত হেলাল।
মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পায়নি পুলিশ
নিহত বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পায়নি পুলিশ। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে।
বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুরের টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মুস্তাফিজুর রহমান নিহত সৌরির মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন।
সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার মরদেহ শনাক্ত করেন নিহতের খালাতো ভাই জহির হাসান। মরদেহের মাথার চুল কালো, উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। কপাল স্বাভাবিক, মুখমণ্ডল গোলাকার। মুখ ও চোখ বন্ধ। নাক থেকে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। ছোট ছোট কালো দাঁড়ি ও গোঁফ। হাত দুটো মাথার সামনা-সামনি বাঁকা ছিল। হাতের মুষ্ঠি খোলা পেয়েছেন সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা।
এ ছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদনে এসআই মুস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, তাহসিফ সৌরির বুক, পেট ও পিঠ স্বাভাবিক ছিল। পা দুটো স্বাভাবিক ছিল। মৃতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত ব্যক্তির পেট ফোলা দেখা গেছে। সাক্ষীদের উপস্থিতিতে এবং দেখানোর মতে তিনি সৌরির মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে তৈরি করেন।
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি হিসেবে। তাঁর সঙ্গে থাকা মুঠোফোনের মাধ্যমে পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
নিখোঁজের এক দিন পর গতকাল বুধবার বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তিনি অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন।
তাহসিফকে নিয়ে তার খালাতো বোনের পোস্ট
এটিকে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন তাহসিফের খালাতো বোন মোশফেকা জাহান।
পোস্টে মোশফেকা জাহান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাহসিফকে দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে। অবসরে পাঠানোর পরও গোয়েন্দারা তাকে নিয়মিত অনুসরণ করতেন বলে তাহসিফ তাকে জানিয়েছিলেন।
তিনি লেখেন, আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে, কী দোষ ছিল তার? হাসিনার পালানো ভিডিও শেয়ার করা? যেটি তিনি নিজেও ধারণ করেননি, নাগরিক হিসেবে শেয়ার করেছেন। তার কলিগদের কেউ করেছেন। অবসরে দেওয়া হয়েছে, দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা দেওয়ার পরও তাদের শান্তি হয়নি। মেরেই ফেলতে হলো তাকে।
তাহসিফের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে মোশফেকা জাহান প্রশ্ন তোলেন, দেশপ্রেমিক হওয়ার কারণেই কি তার ভাইকে এমন পরিণতির শিকার হতে হয়েছে?
পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, সুস্থ তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে তার খালার জুলাই আন্দোলনে রাজপথে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, তার খালার কী অপরাধ ছিল?
মোশফেকা জাহান লেখেন, কথা বলা আর হলো না…..!’শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঐতিহাসিক ভিডিও প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির নাম আলোচনায় আসে। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নিশ্চিত করেনি।
এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছরের ৪ আগস্ট জানায়, কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই এবং সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুসরণ করে অন্য একটি প্রেক্ষাপটে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো পাঞ্জাবি। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন থাকায় সহজেই তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়। তবে ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
তাহসিফের লাশ উদ্ধারের পর বন্ধুর পোস্ট, উঠে এলো কিছু ‘রহস্যময় প্রশ্ন’
তাহসিফের সহপাঠী কে এস এম ইনতিসার ইনজিমাম। তারা আদমজী কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন ও পরে ৭৯ বিএমএ ইক্যুইভ্যালেন্ট কোর্সমেট হিসাবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে কোর্স করেন। ইনতিসার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে।’
‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কাল বাদ আসর তার জানাজা। উত্তরায়।
গত পরশু রাতে সে বাইরে যায় এরপর এই ঘটনা। তার লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা। বাকি সব ক্লিন, এইটা কিসের লক্ষণ আমি এখনি বলতে চাই না তবে এইটা ব্যক্তিগত কোনো কোন্দল বা এক্সিডেন্ট ক্লিয়ারলি প্রমাণিত না হলে আমি ধরে নেব এইটা পলিটিক্যাল।
তাহসিফ সাউরি আদমজী কলেজে আমার বন্ধু ছিল এবং পরবর্তীতে আমরা ৭৯ বিএমএ ইক্যুভেলেন্ট কোর্সমেট হিসাবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে জয়েন্ট সার্ভিস কোর্স করি। ওর সঙ্গে আমার জীবনের আদর্শ আকাশ ও পাতাল কিন্তু আমি যখনই কোন তালিম টাইপ কথা বলতাম চুপ করে শুনত। যদিও I wish he could understand better, but we all lead our lives in our way, maybe that’s what got to him.
৫ আগস্ট এর ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর, তার মানহানি করা হয় নানান বিষয়ে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন পুলিশি কেস করতে পারে নাই আমার জানা মতে। যদিও বহুল করে মানহানি করা হয়েছিল। তাই আমার বিশ্বাস সব কিছু সেই হাসিনার হেলিকপ্টার এর ভিডিও ফাঁসের সঙ্গে কানেক্টেড। কারণ ৫ আগস্টের ঘটনার আগেও ফ্যালকন এই তার ১ সপ্তাহ আগে আমার সঙ্গে দেখা হয়, সে সাধারণ ডিউটি করছিল।
আল্লাহ তাকে মাফ করে দিন এবং তার বিচার করুন। আমিন।’
