✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসংলগ্ন এলাকা থেকে অপহরণ ও গুমের ঘটনায় জড়িত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে পাঠানো রিকুইজিশনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডা এলাকার নিজ বাসা থেকে এএসপি ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়েছে। আদালতে হাজির করার পর বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার জানান, তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন, ২০১২ সালে আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণের ঘটনায় ফজলুর রহমান সরাসরি জড়িত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় ফজলুর রহমান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সুখরঞ্জন বালী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় গাড়ি থেকে নামার পর ফজলুর রহমান তাকে একটি চড় মারেন, শার্টের কলার ধরে ডিবির একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। ওই ঘটনায় তিনি এবং তার টিম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে।
ডিবি জানিয়েছে, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম।
আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আইনজীবীর সঙ্গে গাড়িতে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকের সামনে যান সুখরঞ্জন বালি। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তাঁকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি সাদা ডাবল কেবিন গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। পরে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁকে দুই মাস নির্যাতন করে একটি গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, পরে তাঁকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ বছর আটক থাকার পর দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে সুখরঞ্জনের ছেলে অপূর্ব বালি ভারতে গিয়ে জামিনে বাবাকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনেন।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের দুটি ডাবল কেবিন গাড়িতে করে ফজলুর রহমান ও তাঁর সঙ্গে থাকা সদস্যরা পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের সামনে থেকে সুখরঞ্জন বালিকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে তাঁকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালি নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাঁকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে তাঁর পরিবার ও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছিল, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পতনের পর ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ করেন সুখরঞ্জন বালি। অভিযোগে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়া ও পরে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাঁকে গুম এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বিচারক এ টি এম ফজলে কবির, মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন ও পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।
