মুক্তিযুদ্ধের ছবি তোলা ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই প্রয়াত 

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ছবি তোলা ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রায় প্রয়াত হয়েছে। রোববার দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

রঘু রাইয়ের ছেলে আলোকচিত্রী নিতিন রায় জানিয়েছেন, তার বাবা গত দুই বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন।

তিনি সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, দুই বছর আগে বাবার প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে, কিন্তু তিনি সুস্থ হয়ে যান। এরপর তা পেটে ছড়িয়ে পড়ে, সেটাও সেরে যায়। সম্প্রতি মস্তিষ্কে তার ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে এবং এর পাশাপাশি বয়সজনিত সমস্যাও দেখা দেয়।

রঘু রায় ১৯৪২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমানে পাকিস্তান) পাঞ্জাবের ঝাং-এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬২ সালে তার বড় ভাই ফটোগ্রাফার এস পলের কাছে ফটোগ্রাফি শিখতে শুরু করেন।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার পেশাদার কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৬৫ সালে নয়াদিল্লির ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দেন। সে সময়ে তিনি বিভিন্ন জাতীয় ঘটনা কভার করেন এবং ১৯৬৮ সালে মহর্ষি মহেশ যোগীর আশ্রমে যান। সে সময় ব্রিটিশ ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’ সেখানে ছিল।

ভারতের বহুবিধ রূপ ধরা পড়েছে তার ক্যামেরায়। অনেকে বলেন, তার ছবিতে প্রাণ খুঁজে পাওয়া যেত। তার প্রত্যেকটি ছবি যেন কথা বলে। তার ক্যামেরায় বন্দী হয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, দলাই লামা থেকে মাদার তেরেসাসহ আরও অনেকেই। তার তোলা ১৯৮৪ সালে ভোপাল গ্যাস বিপর্যয়ের ছবিও সমাদৃত। শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও ক্যামেরাবন্দি করেছেন রঘু রায়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে রঘু রায় ছিলেন প্রথম সারির একজন। যুদ্ধের সময় ভারতের দ্য স্টেটমেন্ট পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে ভারতের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির ঘুরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় কষ্ট ও সে সময়কার জীবনযাত্রা তার ক্যামেরায় ফুটে ওঠে।

১৯৭১ সালে কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসোঁর নজরে আসে তার কাজ। বিশেষভাবে সমাদৃত হন এই আলোকচিত্রী। পেশাগত জীবনে একাধিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালে তাকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্মশ্রীও দেওয়া হয়।

রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রী হওয়ার গল্পটা ছিল নেহাতই আকস্মিক। ১৯৬০-এর দশকে একদিন একঘেয়েমি কাটাতে তিনি তাঁর বড় ভাই প্রখ্যাত আলোকচিত্রী এস. পলের ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন। শখের বশে তিনি গাধার ছবি তুলেছিলেন। গাধাটি সরাসরি লেন্সের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাঁর ভাই সেই ছবি লন্ডনের ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকায় পাঠিয়ে দেন। ছবিটা প্রকাশিত হয়।

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং শরণার্থী শিবিরের সেই হাহাকার তিনি তাঁর লেন্সে বন্দি করেছিলেন। মানুষের চোখের শূন্যতা আর যন্ত্রণার সেই ছবিগুলো কোনো শব্দ ছাড়াই ইতিহাসের ট্র্যাজেডি তুলে ধরেছিল। এই কাজের জন্য ১৯৭২ সালে তিনি ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হন। তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম ফটোসাংবাদিক যিনি এই বেসামরিক সম্মান লাভ করেন।

রঘু রাইয়ের কাছে ফটোগ্রাফি ছিল বর্তমান সময়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। তিনি ‘ওয়াইড অ্যাঙ্গেল’ লেন্স ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন। তাঁর মতে, এতে পরিস্থিতির একদম ভেতরে গিয়ে ছবি তোলা যায়। আজকের দিনে ফটোগ্রাফাররা দূর থেকে টেলিফটো লেন্স দিয়ে ছবি তোলেন, কিন্তু রঘু রাই থাকতে চাইতেন ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিষয়ের একদম কাছে গিয়ে তার স্পন্দন অনুভব করাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য।

রঘু রাই বলতেন, ‘আপনি যদি মনে করেন সব শিখে ফেলেছেন, তবে আপনার শেখার পথ বন্ধ হয়ে গেল।’ বারাণসী বা বেনারস শহর তাঁকে খুব টানত। সেখানকার শ্মশানঘাট, গঙ্গার আরতি আর চায়ের দোকানের সাধারণ আড্ডা—সবই তাঁর লেন্সে অসাধারণ ভাবে এসেছে। তাঁর মতে, বেনারস এমন জায়গা যা পোজ দিতে জানে না। আর এই কৃত্রিমতাহীনতাই ছিল তাঁর ছবির প্রাণ।

মাদার তেরেসা বা দালাই লামার মতো মানুষদের ছবি তোলার সময় রঘু বলতেন, তিনি যেন এই মানুষগুলোর মধ্যে ঐশ্বরিক জ্যোতি বা ‘ডিভিনিটি’ দেখতে পাচ্ছেন। ছবি: রঘু রাই

মাদার তেরেসা বা দালাই লামার মতো মানুষদের ছবি তোলার সময় রঘু বলতেন, তিনি যেন এই মানুষগুলোর মধ্যে ঐশ্বরিক জ্যোতি বা ‘ডিভিনিটি’ দেখতে পাচ্ছেন। ফটোগ্রাফি ছিল তাঁর কাছে জীবনের চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি মাধ্যম—আমরা কে এবং কোথায় আমাদের গন্তব্য। ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সেই ভয়াবহ ছবি, যেখানে এক বাবা তাঁর মৃত সন্তানকে দাফন করছেন, তা আজও বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দেয়।

রঘু রাই ৫৬টি বই লিখে গেছেন। ৫৭তম বইয়ের কাজ চলমান ছিল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রঘু রাই ফাউন্ডেশন’-এ তাঁর তোলা ৫০ হাজারেরও বেশি ছবির আর্কাইভ রয়েছে। তাঁর কাজগুলো কেবল ভারতের নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সমানভাবে আদৃত। টাইম, লাইফ, নিউইয়র্ক টাইমস এবং নিউ ইয়র্কারের মতো বিখ্যাত সব প্রকাশনীতে তা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে।

রঘু রাই আজ সশরীরে নেই, কিন্তু রেখে যাওয়া হাজার হাজার ছবি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে যাবে। বিশ্বের অগণিত আলোকচিত্র প্রেমীর হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। তাঁর সেই জাদুকরী লেন্স আর কখনো নতুন কোনো মুহূর্তকে বন্দি করবে না ঠিকই, কিন্তু যে মুহূর্তগুলো তিনি দিয়ে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে পথ দেখাবে। আর তিনি সেই বিস্তৃত মহাকাশে জায়গা করে নিয়েছেন, যেখানে কেবল রয়েছে আলো আর ছায়ার অনন্ত খেলা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *