✍︎ কক্সবাজার প্রতিনিধি ✍︎
টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। পানিবন্দি তিন লাখ মানুষ, সংকট খাবার ও বিশুদ্ধ সুপেয় পানির।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ আজাদের রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১৪ হাজার ৬১ জন। সরকারি ভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার নগদ টাকা।
এদিকে শুক্রবার ভোর থেকে বিভিন্ন এলাকায় আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। আরও দুই শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশুর নাম হাসনাতু জান্নাত (১২)। সে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে। হাসপাতালে ভর্তি দুই শিশু হলো হাসনাতু জান্নাতের বোন জেরিন মনি (৮) আর শাওরিন মনি (৬)। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
কাকরা ইউনিয়নের বাসিন্দা আহমেদুল হক বলেন, ঘরে চাল আছে, তরকারি আছে। কিন্তু রান্না করার জায়গা নেই। মাটির চুলা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এখন শুকনা বা রান্না করা খাবার দরকার। বৃহস্পতিবার ভোরে ঘরে পানি ঢোকার পর থেকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারিনি।
এ দৃশ্য শুধু কাকরার নয়। উপজেলার সুরাজপুর- মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব স্থানে গতকাল হাঁটুপানি ছিল, শুক্রবার সেখানে কোমরপানি দেখা গেছে।
পানি ওঠার কারণে গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বরইতলী ইউনিয়নের ডেইঙ্গাকাটা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, পাঁচটি গরুই তাঁর একমাত্র সম্বল। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নৌকায় করে গরুগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি বাড়ির ছাদে।
ভোক্তভোগীরা জানান, বহু নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির উৎস অচল হয়ে পড়েছে। ঘরে কোমর থেকে বুকসমান পানি থাকায় রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। প্রকট হয়ে উঠছে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ মানুষ।
চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, বাড়িতে কোমরসমান পানি। রান্না করার কোনো সুযোগ নেই। খাবার আর বিশুদ্ধ পানির জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।
চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন বলেন, তিন দিন ধরে পানিবন্দি। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে যা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা খুবই অপ্রতুল।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে অনেক এলাকায় পানি নামতে পারছে না। মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের জন্য।
মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মকবুল আহমদ বলেন, পানি বসতঘর ডুবে গেছে। চুলো জ্বলছে না। অসংখ্য মানুষ না খেয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও ভয়াবহ আকারে সৃষ্টি হয়েছে।
তীব্র স্রোতে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শতাধিক গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
কোনাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার বলেন, উজানের ঢলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে দুই উপজেলার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বন্যার পানিতে মাঠের পর মাঠ আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজিখেত ও শত শত মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। এতে স্থানীয় কৃষক ও মৎস্য চাষিরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে চকরিয়া-মহেশখালী সড়কসহ অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে থাকায় যান চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বান্দরবানের লামা ও আলীকদম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১ দশমিক ৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি কমে গেলে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু হবে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩০ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
অপরদিকে চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী ছাড়াও জমে থাকা বন্যার পানি এখন কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও প্লাবিত করেছে। বিশেষ করে, রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি, কাঠিরমাথা, পানেরছড়া ও চাইল্যাতলী এলাকায় মহাসড়কের ওপর দিয়ে দুই ফুটের বেশি পানি প্রবাহিত হওয়ায় ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ।
এ ছাড়া উখিয়া, কক্সবাজার সদর ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলপথ ও বিভিন্ন অবকাঠামোর কারণে অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না।
