✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
নিউট্রিনো ধরার ফাঁদ তৈরি করে চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন (Francis Halzen)। আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো (কণা) আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স তাঁর নাম ঘোষণা করে।
নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফ্রান্সিস হালজেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন এক ধারার ভিত্তি তৈরি করেছেন। তাঁর ধারণা ছিল, দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো নামের রহস্যময় ও শনাক্ত করা কঠিন কণাগুলোকে খুঁজে বের করা।
এই ধারণার ফল হলো আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি (IceCube Neutrino Observatory)। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, যার মাধ্যমে দূরবর্তী মহাজাগতিক অঞ্চল থেকে আসা নিউট্রিনোগুলোর গতিপথ শনাক্ত ও অনুসরণ করা যায়।
ফ্রান্সিস হালজেন বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে কাজ করছেন। তাঁর দেওয়া ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি তৈরি করেন।
ফ্রান্সিস হালজেন বুঝতে পেরেছিলেন, দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো নামে পরিচিত কণাগুলো শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি প্রায় এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের বরফের বিশাল কাঠামো। যার মধ্যে আলো শনাক্ত করার জন্য বিশেষ লাইট সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে।
এই আইসকিউব ব্যবহার করে গবেষকেরা এখন দূরবর্তী মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপুল শক্তি উৎপন্নকারী প্রক্রিয়া থেকে আসা নিউট্রিনো কণা শনাক্ত করতে পারেন।
নিউট্রিনো মহাবিশ্বের সবচেয়ে লাজুক কণাগুলোর একটি। এর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই, ভরও প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া খুবই কম। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি নিউট্রিনো আপনার একটি নখের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। অথচ আপনি টেরই পাচ্ছেন না।
তবে এই লাজুক কণাগুলোই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাগুলোর খবর আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। কোথায় নক্ষত্র বিস্ফোরিত হচ্ছে, দূর মহাকাশের কোন সক্রিয় গ্যালাক্সিতে প্রচণ্ড শক্তির ঘটনা ঘটছে; এসবের সূত্র লুকিয়ে থাকতে পারে নিউট্রিনোর মধ্যে।
নিউট্রিনোকে বোঝার জন্য আগে ভাবুন, মহাকাশ থেকে ক্রমাগত অসংখ্য কণা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে। এদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় মহাজাগতিক রশ্মি। সাধারণত এগুলো হয় প্রোটন। মহাকাশ থেকে আসা কিছু প্রোটনের শক্তি এত বেশি যে পৃথিবীর কোনো যন্ত্রের সাহায্যে এত শক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রোটনগুলো এত শক্তি পায় কোথায়?
এটি মহাবিশ্বের দীর্ঘদিনের একটি বড় রহস্য। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম বলছে, যে ধরনের মহাজাগতিক প্রক্রিয়া প্রোটনকে এত বিপুল শক্তি দিতে পারে, একই প্রক্রিয়ায় উচ্চশক্তির নিউট্রিনোও তৈরি হওয়ার কথা। তাই উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পারলে বিজ্ঞানীরা হয়তো বুঝতে পারবেন, মহাবিশ্বের কোথায় এসব অতি শক্তিশালী কণার জন্ম হচ্ছে।
১৯০১ সাল থেকে পদার্থে নোবেল দেওয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত ১১৯ বার এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কারটি জিতেছিলেন লরেন্স ব্র্যাগ। অপরদিকে সবচেয়ে বেশি বয়স হিসেবে ৯৬ বছর বয়স্ক আর্থুর আসকিন জেতেন পদার্থের নোবেল। ২০১৮ সালে তার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
বুধবার রসায়নে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার সাহিত্যে ও শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে আগামী শুক্রবার। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।
শুরুতে নোবেল বিজয়ীদের প্রায় দেড় লাখ ক্রোনা দেওয়া হতো। বাড়তে বাড়তে ১৯৮১ সালে তা ১০ লাখ ক্রোনা হয়। এরপর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দ্রুত বাড়ানো হয়। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এর পরিমাণ ১ কোটি ক্রোনা হয়।
সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাড়ানো হয় নোবেল পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী। এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (৯ লাখ ৮৬ হাজার ডলার) পাবেন, যা আগের চেয়ে ১০ লাখ ক্রোনা বেশি। নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের উন্নতি হওয়ায় এ বছর পুরস্কারের আর্থিক সম্মানী বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের তহবিলে টান পড়ায় ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি ক্রোনা থেকে কমিয়ে ৯০ লাখ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে তা বাড়িয়ে ৯০ লাখ এবং ২০২০ সালে ফের এক কোটিতে উন্নীত করা হয়।
গত এক দশকে ইউরোর বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে সুইডিশ ক্রোনা। ফলে পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বাড়ানো হলেও সুইডেনের বাইরে তা ততটা বাড়বে না।
২০১৩ সালে আর্থিক সম্মানী কমিয়ে ৮০ লাখ ক্রোনা করা হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় এই পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়াত ১২ লাখ ডলার। সেটা বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা হলেও বিনিময় হারের খেলায় ২০২৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ডলারের কম। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্যমান খুব একটা বাড়েনি।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার মূল্যমান দাঁড়ায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বেশি।
