✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনের চতুর্থদিনে উত্তাল গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একদিকে যানবাহন চলাচল করলেও অন্যদিকে বন্ধ করে দিচ্ছেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়ে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে জেলার কালিয়াকৈর উপজেলাধীন পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় বিভিন্ন অলিগলি থেকে শ্রমিকরা পুলিশকে টার্গেট করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে। এ ছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে অবরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের পর তারা যানবাহন ভাঙচুর শুরু করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শ্রমিকদের ধাওয়া দিলে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা দূর করতে সোমবার সকাল থেকে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তারা সড়কে অবস্থান করছেন। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ অবস্থায় গাজিপুরের সব কারখানা বন্ধ রয়েছে।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান, তবে তারা আবার মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য আসেন। সকাল থেকে এমন পরিস্থিতি চলছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।
আশুলিয়া
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় ন্যূনতম বেতনসহ তিন দফা দাবিতে পোশাক শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করলে পুলিশ বাঁধা দেয়। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে সাভারের পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
শিল্প পুলিশ ও পোশাক শ্রমিক সূত্রে জানা যায়, ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধির দাবিসহ তিন দফা দাবিতে সকালে নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের বাড়ইপাড়া এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন৷ পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ পোশাক শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সড়িয়ে দেয়। অপরদিকে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তারা বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে এসে জড়ো হন। এ সময় নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, টাউজার লাইন, অনন্ত গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরে শ্রমিকরা সড়কে এসে অবস্থান নিলে পুলিশ বাঁধা দেয়। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়লে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না কর শর্তে নিউ এইজ পোশাক কারখানার এক শ্রমিক বলেন, আমরা আমাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছি। কিন্তু পুলিশ এসে আমাদের ধাওয়া দিচ্ছে। এ ছাড়া পোশাক কারখানার দুই শ্রমিককে রোববার পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি অনতিবিলম্বে গ্রেফতার পোশাক শ্রমিকদের মুক্তির দাবি জানান।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু জানান, সকালে কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা প্রবেশ করে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। এ ছাড়া নিউ এইজ পোশাক কারখানার দুই শ্রমিককে রোববার পুলিশ আটক করেছে বলে ওই কারখানার শ্রমিকরা আজকেও বিক্ষোভ করছেন। পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে আটক করার বিষয়টিকে নিন্দা জানাই।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, সকালে পোশাক শ্রমিকরা নবীনগর-চন্দ্রা সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ ছাড়া বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে শ্রমিকরা অবস্থান নেন। পরে পুলিশ বুঝিয়ে তাদের সড়ক থেকে সড়িয়ে দিয়েছে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে গতকাল (রোববার) নিউ এইজ পোশাক কারখানার এক শ্রমিকে আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গতকাল (রোববার) ১৭৭টি পোশাক কারখানার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেখান থেকে আজ কতগুলো চালু রয়েছে, তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় জানা সম্ভব হয়নি।
মিরপুর
রাজধানীর মিরপুরে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) সকালেও মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় জড়ো হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে নিজ নিজ কারখানায় ফিরে যান।
মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার রোজিনা খাতুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পোশাক শ্রমিকরা আজকেও রাস্তায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের অফিসাররা সকাল থেকে মাঠে রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিরপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রথমে কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অসন্তোষ গতকাল রোববার প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এদিন শ্রমিকদের বিক্ষোভএবং সড়ক অবরোধে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে রোববারও আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামে এবং গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়, কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলনকারীরা চলে যেতে বাধ্য হয়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটকও করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, এর ধারাবাহিকতায় আজ সকালেও মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করেন। তারা মিছিল নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া পুলিশ সদস্যরা তাদের বাধা দেন। একপর্যায়ে শ্রমিকরা পুলিশের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দেয়। একই সময়ে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকা থেকেও শ্রমিকদের আরেকটি দল জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের তৎপরতায় তাদের সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। পরে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে কারখানার ভেতরে ফিরে যান।
মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার জরিনা খাতুন বলেন, ‘শনিবার থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক অসন্তোষের জেরে আজ সকালেও শ্রমিকেরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছিলেন। তারা মিরপুর-১৪ নম্বর থেকে ১০ নম্বরের দিকে আসার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। পরে শ্রমিকেরা গার্মেন্টসের ভেতরে চলে যান। বর্তমানে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে গত দুই দিনের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে হামলার ঘটনার পর মিরপুরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে নেমে এসেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।
বর্তমানে তারা সড়কটি অবরোধ করে রেখেছেন। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রথমে সদর উপজেলার কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হন শ্রমিকরা। পরে ১২টার দিকে তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ করেন বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিক সংগঠনের এক নেতা বলেন, ‘শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তারা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন।’
এ বিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘আমরা অবরোধের খবর পেয়েছি। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে গেছে পুলিশ। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’
