✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎
চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাসাবাড়িতে বেশিরভাগ সময়ই চুলা জ্বলেছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে, ফলে বেড়েছে লোডশেডিং।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামে গ্যাসের দৈনিক স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের শুরুতে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছিল মাত্র ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। কিন্তু আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরও কমে গেছে। ফলে আবাসিক ও শিল্প—সব খাতেই তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
গ্যাসের সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানায় নির্ধারিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আবার, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও দিনে প্রায় সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনও স্বাভাবিক হবে না। এতে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে যেমন গ্যাসের অভাবে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উৎপাদন কার্যক্রম আরও ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়—সবকিছুই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী। এখানে গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাই শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
জানা যায়, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। আবার, জাতীয় গ্রিডে সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ হওয়ার কথা তার একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকার চাহিদা পূরণে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে স্থানীয় চাহিদা আরও অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে এবং গত কয়েক দিনে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। ১ আগস্ট দুপুরের পর থেকে আংশিক ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর বদলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। গ্যাসের প্রেসার ও ফ্লো কম থাকায় পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে টার্মিনালটি সচল না হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের কারণে জনজীবন অচল হয়ে পড়ছে। রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে মিলছে মাত্র ২০০–৩০০ টাকার গ্যাস। এতে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংখ্যা কমে গেছে। যানবাহন সংকটে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এই সুযোগে নগরীতে গণপরিবহনে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নগরীর অসংখ্য বাসাবাড়িতে দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস না থাকায় রান্না বন্ধ। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে।
সোমবার নগরের অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, কর্ণফুলী, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পে গভীর রাত থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক চালক সকাল কিংবা দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না। শুধু আবাসিক নয়, ছোট ব্যবসা ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমও গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘অক্সিজেনের একটি ফিলিং স্টেশনে সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে মাত্র ৩০০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এই গ্যাস দিয়ে গাড়ি চালিয়ে মালিকের জমাও উঠানো যাবে না।’
জানা যায়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। বর্তমানে বিকল্প টার্মিনাল থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে রোববার সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতে।
গ্যাস সংকটের কারণে সড়কে অর্ধেকেরও বেশি সিএনজিচালিত যানবাহন নামতে পারেনি বলে দাবি পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। ফলে সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
ষোলশহর ২ নম্বর গেইট থেকে নিউমার্কেটগামী যাত্রী, বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও কোনো খালি সিএনজি অটোরিকশা পাইনি। শেষ পর্যন্ত কিছুদূর টেম্পুতে, কিছুদূর রিকশায় করে এসেছি। অফিসে দেরি হয়ে গেছে।’
আগ্রাবাদ মোড়ে কথা হয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাকিলের সঙ্গে। বাসে অতিরিক্ত ভিড় থাকায় জাকির হোসের সড়কের এমইএস কলেজে যাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেন তিনি।
গ্যাস সংকটের ধাক্কা পড়েছে আবাসিক এলাকাতেও। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। কেউ গভীর রাতে গ্যাস এলে রান্না করে রাখছেন, আবার কেউ হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। বহদ্দারহাট খতিবের হাট এলাকার বাসিন্দা আফরোজা স্বপ্না বলেন, ‘দুই দিন ধরে বাসায় গ্যাস নেই। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।’
হালিশহর বড়পোল এলাকার রেস্টুরেন্টের কর্মী বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে রান্না কম হচ্ছে, তাতে আমাদের দোকানে বিক্রি বেড়ে গেছে।’
