✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
দীর্ঘ দেড় মাস ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকটের পর অবশেষে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে।
গতকাল সোমবার দেশের শীর্ষস্থানীয় একুশটি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের কলকারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এল।
জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার ফলে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং সার কারখানাগুলোতে এখনো চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে। ফলে এসব খাতে গ্যাসের সংকট পুরোপুরি কাটতে সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসে মোট ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বারবার দরপত্র আহ্বান করা সত্ত্বেও সব কটি কার্গো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত মোট ৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি নিশ্চিত করা গেছে।
সংগৃহীত এই এলএনজি কার্গোগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো থেকে আসছে দুটি এবং খোলাবাজার থেকে স্পট মার্কেট বা ওপেন মার্কেট থেকে ক্রয় করা হয়েছে আরও পাঁচটি কার্গো।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, জাতীয় সঞ্চালন পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ ক্রমাগত বাড়ছে। ইতোমধ্যে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ অনেক বেড়েছে। তবে দীর্ঘ সময় কম চাপ থাকার কারণে উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার গ্রাহকের কাছে স্বাভাবিক চাপে গ্যাস পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। মঙ্গলবার রাত অথবা বুধবার ভোরের মধ্যে অধিকাংশ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, মঙ্গলবার জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনে আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। বিকেল ৪টায় জাতীয় গ্রিডে ২৬০ দশমিক ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। আগের দিন একই সময়ে সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২৩৪ দশমিক ৫৩ কোটি ঘনফুট।
এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে সামগ্রিক গ্যাস পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। আজ দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি)। এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার আগের অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছেছে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত সরবরাহকৃত মোট ২,৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে ১,৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে এবং বাকি ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে আমদানিকৃত এলএনজি (আরএলএনজি) থেকে।
গতকাল সোমবার রাত থেকেই এলএনজি সরবরাহ বাড়ার ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে শুরু করে। এর আগে, ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায় মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২,৫৮২ মিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে দেশীয় গ্যাসের পরিমাণ ছিল ১,৬০২ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আরএলএনজি ছিল ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। একই দিন রাত ৮টায় মোট সরবরাহ ছিল ২,৩৬২ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে আরএলএনজি-র অবদান ছিল ৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুট।
সম্প্রতি, এক্সিলারেট এফএসআরইউ (ভাসমান টার্মিনাল) দুর্ঘটনার কারণে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। বর্তমান সরবরাহের এই মাত্রা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার ঠিক পূর্ববর্তী পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় এক্সিলারেট পরিচালিত এফএসআরইউ-তে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে, যা পরবর্তীতে সারা দেশের সার্বিক গ্যাস পরিস্থিতিতে চরম সংকট তৈরি করে।
পরবর্তীতে গত আগস্ট মাসে এফএসআরইউটি ধীরে ধীরে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করলেও, গত ১৯ আগস্ট এলএনজির মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে টার্মিনালের সরবরাহ আবার বাধাগ্রস্ত হয়। এতে করে দিনে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২,১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। এরপর ২২ আগস্ট পুনরায় টার্মিনালটি থেকে সরবরাহ শুরু হয়, যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মাত্র ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা হচ্ছিল।
