✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া এবং বরখাস্ত হওয়া ১৫০ জন কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সুবিধা পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী, সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিম এবং জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী।
বুধবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিরক্ষা সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুবিধা পাওয়া ১৫০ কর্মকর্তার মধ্যে সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন ও বিমানবাহিনীর ১৪ জন রয়েছেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক বা অকালীন অবসর বাতিল করে বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চাকরি বহাল ধরে স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনেককে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট পদে চাকরির মেয়াদ পর্যন্ত বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এসএসএফের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমীকে ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে তাঁর অবসর সংশোধন করে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে। এতে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন তিনি।
তালিকায় থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে ২০০৯ সালের ২৪ জুন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাঁকে ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল এবং ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অবসরের আগে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও মেজর জেনারেল—উভয় পদে বকেয়া বেতন-ভাতা, বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, এক কোটি টাকা বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং বয়স ও যোগ্যতা সাপেক্ষে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগ পাবেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিমকেও ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁর অবসর সংশোধন করে ২০১২ সালের ৩০ জুন স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে। এতে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদায় বকেয়া বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন তিনি।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বকেয়া বেতন-ভাতা ছাড়াও কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। কারও জন্য এককালীন ৩০ লাখ, কারও জন্য ৫০ লাখ টাকা, আবার কারও জন্য ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কারও জন্য প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি বা বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় প্লট বা ফ্ল্যাট দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বয়স ও যোগ্যতা সাপেক্ষে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নেরও সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের ৩ মে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ ও তিন বাহিনীর সদরদপ্তরের মতামত পর্যালোচনা করে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে প্রত্যেক কর্মকর্তার আগের ও সংশোধিত অবসরের ধরন, অবসরের তারিখ, পদোন্নতি এবং প্রাপ্য সুবিধার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মাহফুজুর রহমানকে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। নতুন সিদ্ধান্তে বাধ্যতামূলক অবসরের তারিখ থেকে ২০২৪ সালের ২৪ মে পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে বেতন, ভাতা ও বিধিমোতাবেক আর্থিক সুবিধা পাবেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আনিসুজ্জামান ভূঁইয়াকে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁকে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে ওই দুই বছরের মেজর জেনারেল পদমর্যাদার বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন তিনি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বদরুল মিল্লাত ভূঁইয়াকে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি অনুযায়ী আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সুবিধা তিনি পাবেন।
নৌবাহিনীর সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁকে ২০১০ সালের মার্চে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৫ সালে স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন তিনি।
বিমানবাহিনীর তালিকায় রয়েছেন এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। ২০০৯ সালে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁর চাকরির মেয়াদ ছয় বছর বাড়িয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গণ্য করা হয়েছে। ফলে ওই সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি অনুযায়ী অন্যান্য সুবিধা পাবেন তিনি। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ বাস্তবায়ন করবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। একই সঙ্গে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি এ-সংক্রান্ত জারি করা আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা আরও যারা পাবেন, তাদের মধ্যে আছেন– লে. জেনারেল আমিনুল কবির, লে. জেনারেল সিনা ইবনে জামালী, মেজর জেনারেল মুহাম্মদ ইশতিয়াক, সফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ রুহুল আমিন, নিজাম উদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, মো. নাঈম আশফাক চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইমাম হোসেন, হাবিবুর রহমান মো. রোকন উদ্দীন, মোজাম্মেল হোসেইন, গাজী আশফাক উদ্দিন আহমেদ, মো. আমিন আকবর, তোফায়েল আহমেদ, নাজিম উদ্দিন, কর্নেল ফরিদ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম, জগলুল আহসান, কবিরুল ইসলাম, লে. কর্নেল ইকবাল এনামুল কবির, শামীমুর রহমান, মেজর রেজা সাঈদ আল হুদা, ওমর হায়াত চৌধুরী, সৈয়দ মনিরুল ইসলাম প্রমুখ। এ ছাড়া এই তালিকায় আছেন– নৌবাহিনীর কমডোর এম আই হোসেন, এম নাসির, সৈয়দ মকছুমুল হাকিম, ক্যাপ্টেন এস এ এম নাসের, মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, মোস্তফা মোহাম্মদ আলী, কমান্ডার এম হারুনুর রশিদ, এ কে এম আহসান হাবিব, আলী মোহাম্মদ রানা প্রমুখ। বিমানবাহিনীর এয়ার কমডোর সৈয়দ ইমতিয়াজ হোসেন, মোহাম্মদ মশিউল আজম, শাহে আলম, খালিদ হোসেন, মো. শাহারুল হুদা, গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. আ. আউয়াল, উইং কমান্ডার মো. মাহমুদুন্নবী প্রমুখ তালিকায় আছেন।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তিন বাহিনীতে বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকার কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাহিনীগুলোর সদরদপ্তর পৃথক পর্ষদ গঠন করে। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতিবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক অন্যায়ের শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের মর্যাদা এবং প্রাপ্য অধিকার পুনর্বহালের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
