✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণ কমিয়ে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।
রোববার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডাটাবেইজে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলো হলো– অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমানো জরুরি। এ লক্ষ্য বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকগুলোর জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদের কাজ চলছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ব্যাংকিং খাতে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএফআরএস-৯) বাস্তবায়ন, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের জামানত মূল্যায়ন, কৃষিঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা হালনাগাদ, খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা নীতিমালা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একজন ঋণগ্রহীতার জন্য পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তি, রিটের মাধ্যমে ঋণ আদায় কার্যক্রম দীর্ঘসূত্রতা ঠেকানো এবং বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশোধনী আইন প্রণয়ন এবং নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে চেক জালিয়াতি ও চেক ডিজঅনার মামলার বিচার আরও কার্যকর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রীর ভাষ্য, শক্তিশালী আইনি কাঠামো, স্বচ্ছ রেজল্যুশন প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।
জামায়াতের এমপি মাহবুবুল আলমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তরুণদের সহজ শর্তে ঋণসুবিধা প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা পাবেন।
মুজিব বর্ষে ভাস্কর্য, বেদি ও কর্মসূচিতে ব্যয় ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ টাকা
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘মুজিব বর্ষ’ পালন উপলক্ষে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এবং শেখ মুজিবের ছবি ও বেদি তৈরি, বিভিন্ন সরকারি অফিসে ব্রোঞ্জ, তামা, মার্বেল পাথরের মূর্তি বানাতে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড তৈরিতে সব মন্ত্রণালয়–বিভাগ মোট ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে এই অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সর্বোচ্চ ২৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৩৩ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪৭ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২৬ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৩ কোটি ২০ হাজার টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।
মাহবুবুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মুজিব বর্ষের ব্যয় নিরীক্ষা বা তদন্তের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মুজিব বর্ষ ছাড়াও আগের সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের আরও অনেক বিষয় রয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে সেগুলোর হিসাব যাচাই করছে। এই যাচাইয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা তো শুধু মুজিব বর্ষ। প্রধানমন্ত্রীর এক বছরে খাওয়াদাওয়ার খরচ হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা।
সরকারের ঋণ ২২ লাখ কোটি টাকা
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, যার মধ্যে আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সুদ বাবদ ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন বিভিন্ন কাস্টমস হাউস কর্তৃক গত পাঁচ বছরে আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে বকেয়া শুল্ক করাদির পরিমাণ ২৫ হাজার ৫০৪ দশমিক ৩ কোটি টাকা।
শেয়ারবাজার অনিয়মে দণ্ড ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা
জামায়াতের সংসদ সদস্য কামরুল হাসানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তথা কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিকারী এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে। এর মধ্যে বেক্সিমকোর শেয়ারসংক্রান্ত লেনদেনে কারসাজির কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৪২৮ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ অব কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেড কর্তৃক চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ২৫ শতাংশ শেয়ার অর্জনে অনিয়মসংক্রান্ত বিষয়ে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলমান আছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, যেসব স্টক-ব্রোকার কোম্পানি বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাৎ করেছে, যেমন তামহা সিকিউরিটিস লিমিটেড, বাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, মশিউর সিকিউরিটিজ ইত্যাদির ট্রেডিং কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামরুল হাসানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গত দুই মাসে সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই সময়ে বাজারে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা গত পাঁচ বছরের তুলনায় বেশি। তিনি বলেন, দেশীয় বিনিয়োগকারী ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির পাশাপাশি বিদেশি ফান্ড ম্যানেজাররাও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
