✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এর আওতায় তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনায় ঋণ দেওয়া হবে।
সরকারের দেওয়া ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে বার্ষিক মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ। তবে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধাভোগীদের যে ঋণ দেবে, তাতে সব ধরনের ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক সুদহার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এ সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের জারি করা এক পরিপত্রে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জারি করা ওই পরিপত্রে বলা হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমাত্রার ব্যবহার উৎপাদন ব্যয়, ভর্তুকির চাপ ও জ্বালানি নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সহজ শর্তে ও স্বল্প ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬–২০৩০) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় এ কর্মসূচির জন্য মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। এর মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকা চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) জন্য সংরক্ষিত ২ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থেকে পুনর্বিন্যাস করে সংস্থান করা হবে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা পরিচালন বাজেট থেকে সংস্থান করা হবে।
এই অর্থ তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫০০ কোটি টাকা করে সরকারি ঋণ দেওয়া হবে।
এ জন্য অর্থ বিভাগ ও প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পৃথক ঋণচুক্তি হবে। ওই চুক্তিতে ঋণের পরিমাণ, অর্থ ব্যবহারের অনুমোদিত খাত, ঋণ পরিশোধ, প্রতিবেদন, নিরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত উল্লেখ থাকবে। অর্থ বিভাগ প্রয়োজন অনুযায়ী অথবা অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদন ও অন্যান্য শর্ত পূরণের পর অর্থ ছাড় করবে।
সরকারি ঋণের সুদহার হবে বার্ষিক দশমিক ৫ শতাংশ। তবে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া সব ধরনের ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক হার (অল-ইনক্লুসিভ ইফেকটিভ অ্যানুয়াল রেট) সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ হতে পারবে। অর্থাৎ ঋণ ব্যবস্থাপনার নামে অতিরিক্ত ফি বা চার্জ নিয়ে নির্ধারিত ৬ শতাংশের সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের অর্থের মেয়াদ হবে ১০ বছর। এর মধ্যে এক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরবর্তী মাস থেকে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের অনুকূলে আসল ও সুদ পরিশোধ শুরু করবে। ঋণচুক্তিতে পরিশোধের বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
সরকারি এ অর্থায়নের আওতায় মূলত গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ঋণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নেট মিটারিং সংযোগ, সোলার হোম সিস্টেম, সৌরচালিত সেচপাম্প, সংশ্লিষ্ট ইনভার্টার, মিটার ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি অথবা অংশীদার ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে যে পদ্ধতিতেই ঋণ বিতরণ করা হোক, পরিপত্রে নির্ধারিত সব শর্ত মানতে হবে। সুবিধাভোগীর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ঝুঁকি বহন করবে সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান।
ঋণ বিতরণের পদ্ধতি, কিস্তির কাঠামো, পণ্য পরিকল্পনা, কর্মসূচির নির্দেশিকা এবং সুবিধাভোগীর যোগ্যতা ও মূল্যায়নের মানদণ্ড নির্ধারণের দায়িত্ব অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই বা ডিউ ডিলিজেন্স করতে হবে এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে।
কর্মসূচির অর্থ বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, ঋণ নবায়ন বা ‘লোন এভারগ্রিনিং’, জমি বা শেয়ার কেনা, ব্যক্তিগত ভোগ, প্রতিষ্ঠানের সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয় কিংবা অন্য কোনো তহবিল বা কর্মসূচিতে স্থানান্তর করা যাবে না।
এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে আলাদা ব্যাংক হিসাব ও পৃথক হিসাব কোড রাখতে হবে। পাশাপাশি পর্ষদ অনুমোদিত পরিচালন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা চালু করতে হবে। ঋণ সুবিধাভোগীদের অনুমোদিত ব্যাংক হিসাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণ করতে হবে।
ঋণ বিতরণের আগে সুবিধাভোগীর যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হবে। কর্মসূচির নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার পাশাপাশি গ্রাহক পরিচিতি যাচাই (কেওয়াইসি) এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের (এএমএল/সিএফটি) বিধানও পরিপালন করতে হবে।
