✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। আমরা সরকারি ও বিরোধী দল কোনো কোনো বিষয়ে দ্বিমত করলেও অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি।
উগ্রবাদ ও চরমপন্থাকে প্রশ্রয় না দেওয়ার প্রশ্নে বিরোধী দলের সম্পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের রীতি অনুযায়ী বিরোধী দলের সঙ্গে আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে। তবে অবশ্যই শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে একমত হয়ে বলব- এই বাংলাদেশ আর যাতে কখনো কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। আর যাতে এই প্রিয় মাতৃভূমি তাঁবেদার তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হতে না পারে- এই প্রশ্নে বিরোধী দল এবং সরকারি দলের মধ্যে রয়েছে জাতীয় ঐক্য। যেকোনো মূল্যে এই জাতীয় ঐক্য অটুট এবং বজায় থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
নতুন কর্মসংস্থান তৈরির আশা প্রকাশ করে সংসদ নেতা বলেন, ভবিষ্যতে আমরা যদি স্বৈরাচার-তাঁবেদার রুখতে চাই; তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্র ও জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমান সরকার কেবল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সহযোগিতার জন্য কার্ড প্রদান করবে তা নয়, আর্থিক সক্ষমতা আমরা অবশ্যই তৈরি করব। একই সঙ্গে আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সেজন্য আমরা বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে পরিকল্পনা নিয়েছি, যার ফলে আশা করি আমরা কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারব।
বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে তারেক রহমান বলেন, আমাদের শহীদরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেখানে ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা হবে শেষ কথা। যে বাংলাদেশে ধনী-গরিব কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। সেই বাংলাদেশে চরমপন্থা বা উগ্রবাদের ঠাঁই হবে না। এই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কেউ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করবে না। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের অবশ্যই নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচিত এই সরকারের লক্ষ হচ্ছে জনগণ, জনগণ এবং বাংলাদেশের জনগণ। বর্তমান সরকার চায়, বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে। যেখানে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সেবা পাবেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ অন্যান্য কাজগুলো আমরা শুরু করেছি। আমরা সব কার্ড পর্যায়ক্রমিক সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধীরে ধীরে কাজ শুরু করেছি। এই সবগুলো কার্ডকে এক সময় আমরা ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ নামে একটি কার্ডের মধ্যে নিয়ে আসতে চাই এবং আমরা সেটা করব।
বক্তব্যের শুরুর দিকে সংসদ নেতা মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের সিপাহী বিপ্লব, ২০১৩ শাপলা চত্বরে গণহত্যা, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারী আন্দোলন, ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ফ্যাসিবাদ সরকারের সময়ে শহীদ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ করেন।
বাজেট অধিবেশনের সমাপনীকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বাজেট নিয়ে যারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন তারাও বলেছেন এই বাজেটটি জনবান্ধব। এই বাজেটের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে আমি সরকারি প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতা কামনা করি। তিনি বলেন, জনগণের কাঙ্ক্ষিত এই সংসদ প্রত্যেক সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টায় জনগণের সংসদ হয়ে উঠেছে। আজও দেখেছি বিল উপস্থাপনকে কেন্দ্র করে সংসদের উভয়পাশ প্রাণবন্ত আলোচনা করেছে। আলোচনা করে যে যার চিন্তা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য। সংসদে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা সরকারের অগ্রাধিকার উল্লেখ করে সংসদ নেতা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদার বাহিনী হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে চাই। দুর্নীতির মাধ্যমে স্বৈরাচারের সময়ে প্রতি বছর এদেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করে দেওয়া হয়েছে। সব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই দুর্নীতি। যেকোনোভাবে হোক সেই দুর্নীতিতে হাত বেঁধে হোক আর টুটি চেপে ধরে হোক- নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, আমরা এই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। আগেও বলেছি, আজও বলছি। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই- আমরা জুলাই সনদ- যেটি স্বাক্ষর করেছিলাম, স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ-অঙ্গীকারাবদ্ধ।
ফ্যাসিবাদ সরকার শিক্ষা ও চিকিৎসা খাত ধ্বংস করে দিয়েছিল মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচারের আমলে প্রতিটি সংগঠন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল শিক্ষা খাত। সেই সময় নকলকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। অটো প্রমোশন দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও আমরা এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। ফ্যাসিবাদের সময় শিক্ষা খাতে যেসব সমস্যা তৈরি করা হয়েছিল, তা রাজনৈতিকভাবে করা হয়েছিল বলে আমি বিশ্বাস করি। আমার কেন যেন মনে হয় ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচার কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী, কোনো একটি বিশেষ দেশকে খুশি করতে এই শিক্ষা খাততে ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছিল। শিক্ষা খাতের উন্নতির জন্য আগামী ৫ বছরে বাজেটের শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করা হবে বলেও জানান সরকারপ্রধান।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা খাতের মতো ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতকেও সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মনে হয় অন্য কারো হাতে তুলে দিয়েছিল। অন্য দেশকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা।
সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জনগণের উপযোগী করে তুলতে চাই। আমরা এই বছর বাজেট ১.২ শতাংশ চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ রেখেছি। আগামী ৫ বছরে এটাকে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চাই।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের আমলে আমরা শুধু উন্নয়নের গল্প শুনেছি। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় সফরে গিয়ে সেই উন্নয়নের গল্প ও বাস্তবতার মধ্যে কোনো মিল পাইনি। স্বৈরাচার ও তার কাছের লোকগুলো নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে বেছে নিয়েছিল। দেড় দশকে এই খাত থেকে হরিলুট হয়েছে কমপক্ষে তিন লাখ কোটি টাকা। কুইক রেন্টাল ছিল তাদের কুইক দুর্নীতির সেক্টর। এই কুইক রেন্টাল থেকে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়। কিন্তু জনগণ তার কোনো সুফল পায়নি। জ্বালানি খাতকে সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর করা হয়। জ্বালানির আপৎকালীন মজুতের ওপর কোনো নজর তারা দেয়নি।
বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জনগণের জীবন এবং সম্পদ সুরক্ষা সরকারের পবিত্র আমানত বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে রাষ্ট্র এবং সরকার হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক। অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময়।
