ঢাকার যানজট কমাতে ৪ উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

রাজধানীর যানজট কমানো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে চারটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে- ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন।

সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ‘রাজধানীর যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পদক্ষেপ নিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। পুরোনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ— সব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’

হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, চারটি উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমানো, গণপরিবহনের চলাচল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা, বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন সড়ক ও উড়ালসড়ক নির্মাণ করে ঢাকার যানজটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বিদ্যমান সড়কের কার্যকর ব্যবহার, বাসের রুট ও চলাচল ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠাও জরুরি।

রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের একটি অংশ যান্ত্রিক ত্রুটি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনের কারণে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ অবস্থায় ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে গণপরিবহনের মান উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়ার ফলে গণপরিবহনের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। বিকল্প বাসের ব্যবস্থা, যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই এবং পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে।

চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। নতুন বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলে সেগুলোর অর্থায়ন, পরিচালন ব্যয় ও পরিবেশগত সুবিধাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাসের চাপ, যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং আন্তজেলা বাসের প্রবেশ ও বহির্গমন নগর চলাচলে প্রভাব ফেলে। এসব এলাকার টার্মিনাল স্থানান্তর বা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হলে কেন্দ্রীয় সড়কে বাসের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নতুন টার্মিনালের অবস্থান, সড়ক যোগাযোগ, যাত্রীদের যাতায়াতের সময়, ভাড়া, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগ বিবেচনায় নিতে হবে। শহরের প্রান্তে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলেও সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়ার পর্যাপ্ত বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য পরিবহনসংযোগ না থাকলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।

আন্তজেলা বাসের যাত্রা শুরু ও শেষের স্থান এবং মহানগরীর অভ্যন্তরীণ বাস চলাচলের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে। টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার নির্দিষ্ট পথ, যাত্রী ওঠানামার স্থান, বাসের অপেক্ষমাণ জায়গা এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা গেলে আশপাশের সড়কে চাপ কমানো সম্ভব।

রাজধানীর পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের উদ্যোগও গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংস্কারের আওতায় কোন কোন রুট রয়েছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

রুট সংস্কার শুধু সড়কের উপরিতল মেরামতের বিষয় নয়। বাস চলাচলের পথ, যাত্রী ওঠানামার স্থান, স্টপেজের অবস্থান, সংযোগকারী সড়ক এবং যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন নীতিমালায় যানবাহনের নিবন্ধন ও পরিচিতি, চালকের যোগ্যতা, নিরাপত্তার মান, অনুমোদিত চলাচল এলাকা, পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলাচল করবে, তা সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহনের গতি ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।

বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা, নির্ধারিত স্ট্যান্ড এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট চালক, মালিক, যাত্রী ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে তা বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়নে বাসের গড় যাত্রাসময়, স্টপেজে অপেক্ষার সময়, যানজটের স্থায়িত্ব, সড়ক দুর্ঘটনার হার, গণপরিবহনে যাত্রীর সংখ্যা এবং পরিবহনের নিয়মিত চলাচলকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *