✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের জীবনবৃত্তান্ত তথা সিভি ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য নিলামে ডেকেছে একটি হ্যাকারগোষ্ঠী। এসব সিভি এক হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছে ‘ম্যাডর্যাক্স’ পরিচয় দেওয়া ওই হ্যাকারগোষ্ঠী।
তাদের দাবি, বাংলাদেশি ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম ‘বিডি জবস’ এর ডাটাবেজ থেকে সিভিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।
কয়েকটি সিভির নমুনাও প্রকাশ করেছে ম্যাডর্যাক্স। তবে এশিয়া পোস্টের কাছে নিজেদের ডাটাবেজ সুরক্ষিত থাকার দাবি করেছেন বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে ‘ডার্ক ফোরামস ডট আর ইউ’ নামক একটি ওয়েবসাইটে সিভি বিক্রির পোস্ট করে ম্যাডর্যাক্স।
নিজেদের দাবির স্বপক্ষে, নমুনা হিসেবে ১৪৮টি সিভি প্রকাশ করেছে ম্যাডর্যাক্স। এগুলো বিনামূল্যেই ডাউনলোড করা যাচ্ছে। সেগুলো ডাউনলোড এবং বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সবগুলো সিভির ধরন একই এবং সেগুলোতে বিডি জবসের সিভি টেমপ্লেটের (ফরম্যাট) সাথে সাদৃশ্য আছে। ১৪৮টি সিভির মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছেন। সিভিগুলোতে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রায় সকল তথ্যই রয়েছে।
নাগরিকদের তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিত কারও দখলে যাওয়া উদ্বেগজনক বলেও সতর্ক করেন আবদুল্লাহ আল জাবের। তিনি বলেন, ‘আপনার সিভিতে কী নেই? আপনার পুরো নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, ইমেইল অ্যাড্রেস, কোথায় কোথায় পড়াশোনা করেছেন, কোথায় কোথায় চাকরি করেছেন-সব কিছু। আপনার এই সংবেদনশীল ডেটা এখন সরাসরি সাইবার অপরাধীদের হাতের মুঠোয়।’
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আপনার এই তথ্যগুলো দিয়ে তারা চাইলেই আপনার নামে ফেক আইডেন্টিটি তৈরি করতে পারে, ব্যাংক বা ফাইন্যান্সিয়াল জালিয়াতি করতে পারে, স্প্যামিং বা ফিশিং অ্যাটাক চালাতে পারে। এমনকি আপনার নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে এমন কোনো ভয়ংকর অপরাধমূলক কাজ করতে পারে যার কিছুই আপনি জানেন না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ডেটা সিকিউরিটির আজ এই বেহাল দশা কেন? বিডি জবস কি আদৌ এর কোনো জবাবদিহি করবে?’
ফোনে বা ইমেইল অপরিচিত কোন মাধ্যম থেকে আসা কল, লিংক বা মেসেজ সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন জাবের। অপরিচিত কোনো মাধ্যম থেকে আসা কোনো লিংকে ক্লিক বা ইমেইলের কোনো এটাচমেন্ট ডাউনলোডে সতর্ক করেছেন তিনি।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের এমন ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, একটি সিভিতে থাকা নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মজীবনের তথ্য একসঙ্গে পেলে সাইবার অপরাধীরা একজন ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, পরিচয় জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণা করা সম্ভব।
বিডিজবসের জরুরি সতর্কবার্তা
বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর তাদের ডাটাবেজে হ্যাকিং বা অনুপ্রবেশের বিষয়টি নাকচ করেছেন। তার বক্তব্য, ডাটাবেজে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটলে প্রতিষ্ঠানটি সবার আগে বিষয়টি জানতে পারত।
চাকরিদাতারা বিডিজবস থেকে চাকরিপ্রার্থীদের সিভি সংগ্রহ করতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য উৎস থেকেও সিভির তথ্য ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছে বিডিজবস।
এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তথ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের প্রোফাইল কে দেখতে পাবে কে দেখতে পারবে না সেই বিষয়েও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিডিজবসের ভাষ্য, চাকরির আবেদনকারীদের তথ্য তাদের প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনেই অ্যাক্সেস ও ব্যবহার করতে পারে। কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীর তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির চেষ্টা করলে এবং তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, যাচাই না করে কোনো ধরনের গুজব বা ভুয়া খবরে বিভ্রান্ত হবেন না এবং তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। যে কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর নির্ভর না করে প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল উৎস থেকে যাচাই করার অনুরোধ জানিয়েছে তারা।
