✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজসহ আসামি করা হয়েছে ৪১ জনকে।
রোববার (১৯ জুলাই) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এ প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে হস্তান্তর করে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, নথিপত্রগুলো বর্তমানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তে এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ৩২ জন নিহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড সুপিরিয়র রেসপনসিবলিটি রয়েছে। একদম পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কারণ যখন ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই সংগঠনটিকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য নানা পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তারা। প্রতিবেদনটি এখন পর্যালোচনা বা চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। যেন একটি সঠিক তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিচার হয়। প্রকৃত আসামিরা যেন বিচারের সম্মুখীন হন। এজন্য হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আজ খসড়া প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছি। শিগগিরই পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে পাবো বলে আশা করছি।
আসামিদের তালিকায় কারা রয়েছেন জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, এই প্রতিবেদনটি খসড়া। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত আসামিদের তালিকা আমরা প্রকাশ করতে পারছি না। তবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মামলার প্রধান আসামি। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এছাড়া সাবেক পুলিশপ্রধান, বিজিবি প্রধানসহ কয়েকজনেন বিরুদ্ধে খসড়া প্রতিবেদন এসেছে। এসব আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব।
তিনি আরও বলেন, খসড়া প্রতিবেদন হওয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে আসামিদের নাম সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। হেফাজত ইসলামের নেতারা এ ঘটনার জ্বলন্ত বা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তারা এ বিষয়ে আরও বেশি ওয়াকিবহাল রয়েছেন। আমাদের তদন্তের ওপর তাদের আর কোনো বক্তব্য থাকলে নিশ্চয়ই বলবেন। তবে কে আসামি হবেন, আর কে হবেন না; তা ফরমাল চার্জ দাখিলের পরই সবাই জানতে পারবেন।
নিহতদের তালিকা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা এ পর্যন্ত নিহত প্রায় ৬১ জনের একটি তালিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু ৫৮ জনের পরিচয় এরই মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকিদের এখনও সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের তালিকা ৬১ জনের।
তবে তদন্তের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ছাড়াও তৎকালীন পুলিশ প্রধান, র্যাব মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনারকে আসামি করা হয়েছে।
পাশাপাশি আসামির তালিকায় রয়েছেন একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা এবং সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরসহ বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবী।
আগামী ২১ জুলাই নির্ধারিত সময়েই এই তদন্ত প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের সেই নৃশংস গণহত্যার মামলার অগ্রগতি জানতে আজ সকালে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আসেন হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হামিদ-এর নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ সদস্যের এই প্রতিনিধি দল চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সাক্ষাৎ শেষে নেতারা এই কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। দিনভর আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ কমান্ডো স্টাইলে অপারেশন সিকিউরড ঢাকা চালানো হয়। ওই রাতের অভিযানে শত শত মাদরাসা ছাত্র ও তৌহিদী জনতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুম করার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হেফাজতে ইসলাম এ ঘটনার তদন্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে। পরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই তদন্ত সম্পন্ন করে।
বর্তমানে এই মামলায় চারজন আসামি গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন ,সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম।
