✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগার থেকে মুক্তি পেলে দেশটির সেনাবাহিনী বা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে সংঘাতে জড়াবেন না বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরান খান মুক্তি পেলে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না, যা দেশের ক্ষতি করতে পারে। তিনি ইমরানকে ‘উদারমনা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দেশের স্বার্থে সেনাবাহিনী বা সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না গিয়ে নিজের ক্ষোভ ও কষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।
বুখারির এ মন্তব্যকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে পিটিআইয়ের অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলটির সমর্থকরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের পর ২০২৩ সালে ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোর পেছনে মুনিরের ভূমিকা ছিল।
ইমরান খান নিজেও অতীতে মুনিরকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তবে এবার তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্যে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেল।
বুখারি বলেন, ‘ইমরান খান আগামীকাল মুক্তি পেলেও এমন কিছু করবেন না, যা কার্যত দেশের ক্ষতি করবে।’ তিনি আরও বলেন, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত কষ্ট ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
ইমরান খানের চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত। এই আইনি অগ্রগতির পরই বুখারি এসব মন্তব্য করেন। পরে কারাবন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়াও হয়। তাকে রাজধানী ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
তবে ইমরান খান নিজে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে পুনর্মিলনের বিষয়ে একই অবস্থান পোষণ করেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর আগে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে রিভিউয়ের (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেছে দেশটির সরকার।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদনটি করেন ইসলামাবাদের অ্যাডভোকেট জেনারেল নাভিদ হায়াত মালিক। সরকারের দাবি, ইমরান খানকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার এই অন্তর্বর্তী আদেশ ‘বৈষম্যমূলক’ এবং আদালত তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা করার কথা বলা হয়।
সরকারের আবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ১৯৭৮ সালের কারাবিধিতে কারাবন্দিকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ওই নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে বন্দিকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়।
সরকারের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের আদেশে এই কারাবিধির ১৯৭ নম্বর নিয়মটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। আদালত নিয়মটি বিবেচনা করলে এমন আদেশ দেওয়া হতো না বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তান সরকার আরও বলেছে, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে ব্যক্তিগত পছন্দের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দিলে কারাগারের পুরো বিচার ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
আবেদনে পাকিস্তানের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার বলেছে, সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইমরান খানকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিশেষ সুযোগ দিলে একই অবস্থায় থাকা অন্য বন্দিরাও একই সুবিধা দাবি করতে পারেন।
সরকারের ভাষ্য, এতে কারাবন্দিদের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক বন্দি একই ধরনের সুবিধা চেয়ে আদালতে আবেদন করতে পারেন।
এ ছাড়া ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার আবেদনে ইসলামাবাদের জেলা নির্বাচন কমিশনারকে বিবাদী করা হলেও তাকে আদালতের শুনানির আগে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছে সরকার। সরকারের মতে, এটি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে প্রথমবার শুনানির জন্য ওঠার সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়নি। অথচ অন্তর্বর্তী আদেশের মাধ্যমে ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়া, ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের চিকিৎসায় যুক্ত করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার মতো প্রায় সব দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, অন্তর্বর্তী পর্যায়ে আদালত এমন কোনো চূড়ান্ত সুবিধা দিতে পারে না, যার ফলে মূল মামলায় আর কার্যত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাকি থাকে না।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের আগে আদিয়ালা কারাগার কর্তৃপক্ষ তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। এতে বলা হয়, কারাগারে তাকে নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং চিকিৎসা কর্মকর্তারা দিনে তিনবার তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন।
তবে ওই প্রতিবেদনের সংযুক্ত নথিতে বলা হয়, গত ১ আগস্ট চিকিৎসকরা ইমরানের অনিয়ন্ত্রিত ও ওঠানামা করা রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেন। পরে ১০ আগস্ট একটি মেডিকেল বোর্ডও তাকে পরীক্ষা করে। বোর্ড নিয়মিত হাঁটা, মানসিক চাপ কমানো এবং পরিবারের সঙ্গে আরও ঘন ঘন যোগাযোগের পরামর্শ দেয়।
সরকারের দাবি, ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার আগে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। আদালত নিজে চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নয় বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
