মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করেছে 

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে জিডিপির অনুপাতে কর আদায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়া, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

শনিবার রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) আয়োজিত জাতীয় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিযোগিতা ‘ইকোনথন ২০২৬’–এর গ্র্যান্ড ফাইনালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখি, অনিশ্চয়তাই এখন স্বাভাবিক অবস্থা। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মন্থর, গত দশকের তুলনায় অর্থায়নের খরচ বেশি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ ও শুল্কবাধা বাড়ছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়কে অস্থির করে রেখেছে। জলবায়ু পরিবর্তনও প্রতিবছর অর্থনৈতিক ক্ষতির নতুন হিসাব যোগ করছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে বৈশ্বিক এসব ধাক্কার সরাসরি প্রভাব পড়ে।’ এর প্রভাব বাজারে পণ্যের দাম, টাকার বিনিময় হার এবং দেশের কারখানাগুলোর রপ্তানি আদেশে দেখা যায় বলে জানান তিনি।

নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ে আমাদের প্রতিটি দিনই সারপ্রাইজ এলিমেন্টের দিন (চমকের দিন)। বাজেট তৈরি হয় এক অনুমানের ওপর, তারপর আসে জ্বালানির দামের ধাক্কা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বন্যা কিংবা বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা। অসম্পূর্ণ তথ্য ও সীমিত সময়ের মধ্যেই জনগণের কাছে জবাবদিহি রেখে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’

দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের ভেতরে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করেছে, জিডিপির অনুপাতে কর আদায় আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ও ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো জরুরি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি—সময়সূচি যা-ই হোক, আমাদের রপ্তানিকে বাণিজ্যসুবিধার বদলে প্রতিযোগিতার শক্তিতে টিকে থাকতে শেখাবে। সমস্যা লুকিয়ে লাভ নেই, স্বীকার করলেই সমাধান শুরু হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার তাই স্পষ্ট—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনা, করব্যবস্থাকে ন্যায্য, সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় জনগণের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ ফল নিশ্চিত করা। এক দিনে সব ঠিক হবে না, কিন্তু এই লক্ষ্যে আমরা অবিচল থাকব।’

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সময়সূচি যা-ই হোক, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অর্থনীতিকে প্রস্তুত করতে হবে।

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘চাপের মধ্যে ভাবা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান রক্ষা করার সক্ষমতাই নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।’

মন্ত্রণালয়কে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৪টি দল ‘ইকনথন ২০২৬’-এ নিবন্ধন করেছে। কুইজ, কেস সলভিং ও পলিসি মেকিংভিত্তিক প্রতিযোগিতার বিভিন্ন কঠিন ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছানো শিক্ষার্থীদের তিনি প্রশংসা করেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষতা ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না এবং সততা ও মানবিকতা ছাড়া সেই দক্ষতা সমাজকে সঠিক পথ দেখাতে পারে না।’

তিনি বলেন, অর্থনীতি শুধু পরীক্ষা পাসের বিষয় নয়, এটিকে অনুধাবন করতে হবে এবং দেশের সেবায় নীতি ও সততার সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউআইইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হাসান মাহমুদ রাজা এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউআইইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ও ইউনাইটেড গ্রুপের উপদেষ্টা কে এম এ শামীম।

ইউআইইউর ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আবুল কাশেম মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অর্থমন্ত্রী।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *