𓂃✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক 𓂃✍︎
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হচ্ছে। জলপথটি ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার পূর্ব ঘোষিত সমন্বিত রুট অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ শুরু করার ঘোষণা দেয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত তেল পরিবহন পথটি কার্যত বন্ধ করে রাখে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননের শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ইরান এই নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে।
আরাঘচি তাঁর পোস্টে আরও বলেন, জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ‘পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশন’ কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত ও সমন্বিত রুট বা পথটি অনুসরণ করতে হবে।
এর আগে গতকাল লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনব্যাপী একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে তিনি জানান, ‘আজ ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম বিকেল ৫টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা) থেকে এই যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানান, চুক্তি করার আগে তিনি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ‘চমৎকার’ আলোচনা করেছেন। তিনি আরও জানান, দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন দুই নেতা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছিল। এবার লেবানন যুদ্ধের সাময়িক বিরতির প্রেক্ষাপটে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ খোলার ঘোষণায় তেলের দাম কমল ১৩ শতাংশ
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিতে শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধস নেমেছে। ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময়কালে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই ঘোষণার পরপরই তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২.৮৭ ডলার বা প্রায় ১২.৯৫ শতাংশ কমে ৮৬.৫২ ডলারে নেমে আসে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১৩.৫০ ডলার বা ১৪.২৬ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৮১.১৯ ডলারে। উভয় সূচকই ১০ মার্চের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছায় এবং এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় দৈনিক পতনের মুখে পড়ে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, লেবাননকে ঘিরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিয়েছে। ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলে পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হতে পারে, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল কতটা বাড়ে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, যা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান ভবিষ্যতে আর কখনো প্রণালি বন্ধ করবে না বলে সম্মত হয়েছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতার প্রস্তাব দিয়েছে।
একই সঙ্গে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং নতুন করে আলোচনা শুরুর সম্ভাবনাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে সামরিক অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি খুলে দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও ইউরোপীয় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপে তেল পৌঁছাতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে। পাশাপাশি পারমাণবিক ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ খুললেও ইরানের বন্দর অবরোধ থাকবে
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান উন্মুক্ত করে দিলেও দেশটির ওপর নৌ-অবরোধ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া পৃথক দুটি পোস্টে তিনি এই অবস্থান পরিষ্কার করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পোস্টে লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালি এখন ব্যবসা এবং জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে ইরানের সাথে আমাদের যাবতীয় লেনদেন বা চুক্তি শতভাগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে।’
তবে এই সমঝোতা প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুত শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, চুক্তির অধিকাংশ পয়েন্ট বা বিষয় ইতোমধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ঘোষণা করেন, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির প্রতি সম্মান জানিয়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা হয়েছে। লেবাননে ১০ দিনের এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে।
উল্লেখ্য, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত। গতকাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননে এই ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। যদিও সমুদ্রপথটি উন্মুক্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরেছে, তবে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ বহাল থাকায় দুই দেশের মধ্যকার চূড়ান্ত সমঝোতা এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ খোলায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন
ইরান হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়।
বাজার বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনের শুরুতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৯৮ ডলারের উপরে থাকলেও ঘোষণার পর তা ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজার সূচক ‘নাইমেক্স’ (NYMEX)-এ লাইট সুইট ক্রুডের দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের নিচে। কিন্তু মার্চ মাসের শুরুতে সংঘাতের জেরে এই দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং মাসের শেষের দিকে তা রেকর্ড ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। দীর্ঘ উত্তেজনার পর সমুদ্রপথটি খুলে দেওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশায় বাজারে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
মূলত লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষিতে ইরান এই সিদ্ধান্ত নেয়। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম তেল পরিবহন পথ হওয়ায় এই পথটি খুলে দেওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
হরমুজ ইস্যুতে ৪০ দেশের ভার্চুয়াল বৈঠকের ডাক
হরমুজ প্রণালি আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। দেশ দুটি একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের আয়োজন করেছে। আজ শুক্রবারের এ বৈঠকে প্রায় ৪০টি দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে হরমুজ প্রণালি আবার চালুর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বনেতারা প্রণালিটি আবার চালু করতে একটি আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের উদ্যোগ নেবেন।
বৈঠকে প্রায় ৪০টি দেশের নেতারা ইরানের যুদ্ধবিরতি সমর্থন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করবেন তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়। এর পর থেকে তেহরান নিজেদের ছাড়া অন্যান্য জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। যুদ্ধবিরতির পর সেটি খুলে দেওয়ার আশা জাগলেও উল্টো কাজ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র গত সোমবার ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ভালো অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনিরাই সাফল্য পাবে এবং এ যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনটাই মনে করেন।
তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘সাফল্যের সঙ্গে’ এগোচ্ছে। এটি শিগগিরই শেষ হবে। নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। শুক্রবার আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং পরিস্থিতি দ্রুত শেষের দিকে যাচ্ছে। এর আগে অন্য অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার খুবই কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
