২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা কমেছে ৮১ শতাংশ

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

ইসলামী ব্যাংকের ২০২৪ সালে ব্যাংকের নিট মুনাফা ৮৩ শতাংশ কমে মাত্র ১০৮ কোটি টাকায় নেমে আসে, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৬৩৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মুনাফা আরও ৮১ শতাংশ কমে যায়।

ব্যাংকের আমানত ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে যাত্রা শুরুর পর ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৩ বছরে ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৬৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৭ বছরে ব্যাংকটির আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২৫ শতাংশ। এদিকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। তবে এই অর্থের অধিকাংশই একটি রাজনৈতিক দলের নির্দেশে তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের নির্বাচনি প্রচারে ব্যয় হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

২০১৭ সালে রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপক অগ্রগতি হয়। এ সময় ইসলামী ব্যাংক দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এককভাবে আহরণ করে কিন্তু বর্তমানে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হয়ে তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

২০১৬ সালে যেখানে ব্যাংকটির মাধ্যমে ৩৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য ওস বা আমদানি করা হয়, যা ২০২৩ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র সাত বছরের মধ্যে ব্যাংকটির আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা হয়। ২০২৫ সালে তা আবার কমে ৫৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। ২০১৬ সালে রপ্তানি হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার, যা ২০২৩ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৪২ শতাংশ বেড়ে হয় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এর পরের দুই বছরেই উল্লেখযোগ্য হারে  রপ্তানি কমেছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সময়ে ব্যাংকের মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এই খাতে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকে পরিণত হয় ইসলামী ব্যাংক। ২০২৪-এর শেষার্ধ থেকে অদক্ষ বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে ব্যাংক লোকসানে চলে গেছে। প্রকাশ্যে মুনাফায় থাকা ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ ইসলামী ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির ‘গুপ্ত’ লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। 

২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত অর্জিত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ সাল শেষে মুনাফা দেখানো হয়েছে, যা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নয়। এদিকে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেও মুনাফা দেখিয়েছে ব্যাংকটি। সব ব্যাংক ২০২৫ সালের মুনাফা ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক মুনাফা ঘোষণা করেনি। 

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগ সব সময় ৪ শতাংশের নিচে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির ম্যানেজমেন্ট ও বোর্ড বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিনিয়োগ জোরপূর্বক খেলাপি করে। এ কারণে তা ৪৮ শতাংশে পৌঁছায়। অতীতে কখনো ইসলামী ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ না হলেও ২০২৪ সাল থেকে বিরাট অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ে, যা বর্তমানে টাকার অঙ্কে ৭৮ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এই প্রভিশন ঘাটতি পূরণ বা সংরক্ষণ করতে হলে ব্যাংকের সময় লাগবে মোট ১৪০ বছর যা কার্যত সম্ভব নয়।

সার্বিক বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, বিগত ১৮ মাসে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অদক্ষ বোর্ড ও ম্যানেজমেন্ট মিলে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ব্যাংকটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে দেশের অর্থনীতির প্রাণ খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি অস্তিত্বসংকটে পড়বে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের ব্যাংক খাত ও জাতীয় অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে কার্যকর নীতি, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *