✍︎ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ✍︎
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে গোপনে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল ইসরায়েল—এমন দাবি উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে সহায়তা করার জন্য যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে এই ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল। বিষয়টি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র অবগত থাকলেও ইরাক সরকার কিছুই জানত না।
ওই গোপন ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর একটি লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছিল। সেখানে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলও মোতায়েন ছিল, যাতে ইরানের আকাশসীমায় কোনো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে দ্রুত পাইলটদের উদ্ধার করা যায়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন স্থানীয় এক রাখাল মরুভূমিতে অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন, নিচু দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ছে এবং নির্জন এলাকায় সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড চলছে। পরে বিষয়টি ইরাকি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। মার্চের শুরুতে ইরাকের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ওই এলাকায় তদন্ত করতে সেনা পাঠানো হয়েছে।
তদন্তকারী সেনাদের ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছাতে বাধা দিতে ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়। এতে একজন ইরাকি সেনা নিহত এবং আরও দুজন আহত হন। পরে আরও দুটি ইউনিট পাঠানো হলে তারা এমন কিছু প্রমাণ নিয়ে ফিরে আসে, যা ওই এলাকায় সাম্প্রতিক সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের উপ-প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কায়েস আল-মুহাম্মাদাভি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এই বেপরোয়া অভিযান কোনো ধরনের সমন্বয় বা অনুমোদন ছাড়াই চালানো হয়েছে। মনে হচ্ছে, বিমান সহায়তায় স্থলভাগে একটি বিশেষ বাহিনী কাজ করছিল, যা আমাদের ইউনিটগুলোর সক্ষমতার বাইরে ছিল।’
পরে বিষয়টি নিয়ে ইরাক জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে এবং হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। তবে মার্কিন এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ওই নির্দিষ্ট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, জনবসতিহীন ও বিশাল পশ্চিম ইরাকি মরুভূমি গোপন সামরিক তৎপরতার জন্য উপযোগী এলাকা। অতীতে ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনবিরোধী অভিযানের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র একই অঞ্চল ব্যবহার করেছিল।
কেন ইরাকের এই মরুভূমিতে আস্তানা
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই নাজাফ মরুভূমি। এর বিস্তার সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবের সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
ঐতিহাসিকভাবে এই মরুভূমিটি সেনাদের চলাচল, অস্ত্র ও সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য ব্যবহৃত হতো।
জনশূন্য হওয়ায় ইরাকি বাহিনীর পক্ষে সেখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন ছিল, যার সুযোগ নিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী।
মরুভূমির ভেতরেই একটি উপত্যকায় সুকৌশলে লুকানো ছিল ইসরায়েলের ঘাঁটিটি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়ানোর জন্যই সতর্কতার সঙ্গে ওই জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
নিউইয়র্কভিত্তিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের গবেষণা প্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, ‘১৯৯১ ও ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযানেও মার্কিন বিশেষ বাহিনী এই এলাকাটি ব্যবহার করেছিল।’
নাইটস আরও বলেন, ইরাকের মরুভূমিতে বসবাসকারীরা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সশস্ত্রগোষ্ঠী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের কার্যকলাপ দেখেছে এবং সেখান থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। ওই এলাকার এই জনশূন্য অবস্থাকেই কাজে লাগিয়েছে ইসরায়েল।
ঘাঁটি ব্যবহার যেভাবে প্রকাশ্যে এলো
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনমানবশূণ্য নাজাফ মরুভূমিতে বিদেশি সেনাদের আনাগোনা ধরা পড়ে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, স্থানীয় এক মেষপালক ওই এলাকায় হেলিকপ্টার চলাচল ও অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা দেখে বিষয়টি ইরাকি কর্তৃপক্ষকে জানান।
খবর পেয়ে ইরাকি সেনারা গাড়িতে করে একদিন ভোরে ওই স্থানের দিকে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই তারা তীব্র গুলিবর্ষণের মুখোমুখি হয়। আকাশ থেকেও তাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় এক ইরাকি সেনা নিহত ও দুজন আহত হন।
পরে ইরাকের কাউন্টার টেররিজম সার্ভিসের আরও দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধান চালায় এবং সেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির প্রমাণ পায়।
ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কায়েস আল-মুহাম্মাদাউই সেসময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে হামলার আগে সেখানে একটি বিশেষ বাহিনী অবস্থান করছিল। যারা আকাশপথে সহায়তা পাচ্ছিল এবং তাদের সক্ষমতা আমাদের ইউনিটগুলোর চেয়ে বেশি ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বেপরোয়া অভিযান কোনো সমন্বয় বা অনুমতি ছাড়াই চালানো হয়েছে।’
এ ঘটনায় পরে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে জাতিসংঘে অভিযোগ জানায় ইরাক।
যদিও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, ওয়াশিংটন সরাসরি ওই হামলায় জড়িত ছিল না।
যেসব আলামত পাওয়া গেল
প্রাথমিক পর্যায়ে ইরাকের কাউন্টার টেররিজমের দুটি ইউনিট ওই ঘাঁটিতে অনুসন্ধান চালালে সেখানে কোনো সেনাসদস্যকে দেখতে পায়নি।
তবে, রাডারসহ বেশ কিছু সামরিক সরঞ্জাম পাওয়া যায়, যেগুলো তারা জব্দ করে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণে জানা যায়, এসব সরঞ্জাম মূলত জ্যামিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
গত শতাব্দীর শেষদিকে সাদ্দাম হোসেনের আমলের ওই বিমানঘাঁটিতে ‘সিএইচ-৫৭ চিনুক’ হেলিকপ্টারও দেখা গিয়েছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারবাহী সামরিক হেলিকপ্টার।
ইরাকের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, প্রাপ্ত আলামত দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওই ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি ইসরায়েলি কারিগরি দল কাজ করছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তার মতে, শত্রু অঞ্চলে কমান্ডো অভিযান চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বিশেষ ইউনিট ওই ঘাঁটিতে উপস্থিত ছিল।
এটি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছিল।
ইসরায়েল সেখানে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলও মোতায়েন করেছিল, যেন জরুরি উদ্ধার কাজে তারা দ্রুত সাড়া দিতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতেই স্থাপনাটি তৈরি করে ইসরায়েল।
যে কারণে ইরানে এত ক্ষয়ক্ষতি
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশ ঝুঁকি নিয়েই গোপনে এই ঘাঁটিটি স্থাপন করেছিল ইসরায়েল।
আর এর মাধ্যমেই ইরানের আরও কাছে যেতে পেরেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। এতে হামলা করাও সহজ হয়।
পাঁচ সপ্তাহব্যাপী ইরান অভিযানে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হাজার হাজার হামলা চালিয়েছে।
ইরাকের ঘাঁটির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্পষ্ট হয়, ইসরায়েল কীভাবে প্রায় এক হাজার মাইল দূরের শত্রুর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, মার্কিন বাহিনী প্রায়ই সামরিক অভিযানের আগে অস্থায়ী অভিযান পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপন করে থাকে। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে মার্কিন সেনাদের উদ্ধারে ইরানের ভেতরে একটি অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল এবং সেটি ব্যবহার করা হয়।
ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর প্রধান তোমের বারের সেনাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক চিঠিতে এমন গোপন অভিযানের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
