জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ৫০৭৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ৪ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে বেলাল হোসেন রাব্বি নামে এক যুবক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর মা জেসমিন আক্তার শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার তদন্তে নেমে এজাহারে উল্লেখ আসামিদের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে রাব্বি হত্যাকাণ্ডে কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি। তবে এজাহারভুক্ত ১২ জনের পাশাপাশি এবং তদন্তে নতুনভাবে শনাক্ত আরও ছয়জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে পিবিআই। 

শুধু রাব্বি হত্যা মামলা নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে হয়রানিমূলক আসামি করা হয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ জন্য ৭৯৮টি মামলায় ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। 

পাশাপাশি অন্তত ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কোনো মামলা তদন্ত করার পর সাক্ষ্য-প্রমাণ না পেলে বা মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করে সেটিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলে। এ ছাড়া পুলিশ গত ১৬ মে পর্যন্ত জুলাইয়ের ১৭৫টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এতে মোট আসামি ১৩ হাজার ৮২৪ জন। 

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৫৬টি। 

অভিযোগপত্র দেওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৩। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জন এজাহারনামীয়, বাকি ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। এ ছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারনামীয়, বাকি ২ হাজার ৯২৭ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। 

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এ ধারা ১৭৩ (এ) সংযোজন করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। এই ধারা অনুযায়ী, হয়রানিমূলক কারও নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবেন এবং আদালত প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। এই ধারার আওতায় ডিএমপির বিভিন্ন থানার ৩৫৪ মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। 

এর বাইরে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) বিভিন্ন থানার ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জনকে, চট্টগ্রামে (সিএমপি) ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে (জিএমপি) ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে (আরএমপি) ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে (বিএমপি) ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় (কেএমপি) ১টি মামলায় ৫ জন ও রংপুরে (আরপিএমপি) ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়। 

একইভাবে ঢাকা রেঞ্জের ৯টি জেলার ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৬টি জেলার ৩৪টি মামলায় ৯৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ৮টি জেলার ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৪ জেলার ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ৩ জেলার ১২ মামলায় ২৮ জন, ময়মনসিংহের ৪ জেলার ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২ জেলার ২ মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ৩ জেলার ২০টি মামলায় ১৪০ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। 

থানার মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থাটি। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের ২৭২টি মামলার তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৪টি এবং অন্যান্য ধারার মামলা ১৮৮। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এসব মামলার মধ্যে মোট ১৬৫টির তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে, যার ৪২টি হত্যা মামলা, বাকি ১২৩টি অন্যান্য ধারার। তদন্তাধীন আছে ১০৭টি মামলা।

সংস্থাটির তদন্ত শেষে নিষ্পত্তি হওয়া ১৬৫ মামলার মধ্যে ১১১টিতে ঘটনার প্রমাণ মিলেছে, যার শতকরা হার ৬৭ দশমিক ৩। এসব মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে; যার মধ্যে ১৯টি হত্যা মামলা ও ৯২টি অন্য ধারার। এর বাইরে ৩১টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে; যার ১২টি সিআর ও দুটি জিআর মামলাকে মিথ্যা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যে কোনো সিআর মামলায় বাদীর আদালতে হাজির না হওয়া, মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া ও একই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা। এ ছাড়া অন্যান্যভাবে নিস্পত্তি হয়েছে ২৩টি (অধিকাংশ সিআর মামলা); যেসবের বাদী অনীহাসহ নানা কারণে আদালতের কাছে আবেদন করে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। 

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯ হাজার ৬৯১ জন আসামির মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে এজাহারনামীয় ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে বেশির ভাগই সিআর মামলা। 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে পূর্ব বিরোধ, প্রতিশোধপরায়ণতা কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অনেককে এসব এজাহারে আসামি করা হয়েছিল। এমন ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যারা ঘটনার সময় দূরের কথা, কয়েক বছর ঢাকায় অবস্থানই করেননি। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *