বিতর্কিত খুরশীদ আলম ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ ও চাপের মুখে পদত্যাগ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিতর্কিত সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

রোববার (২৪ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এর আগে একই দিন বিকেলে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান গভর্নরের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। গত বছরের ২৩ জুলাই তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

২০১৭ সালে মো. খুরশীদ আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসপ্রধানের (মহাব্যবস্থাপক) দায়িত্ব পালনের সময় কৌশলে কেনাকাটা ও সংস্কারের অন্তত ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নিজের মেয়ে ও তার বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়নের বিল দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি তদন্ত প্রতিবেদন, বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা ও সমকালের নিজস্ব অনুসন্ধানে অর্থ আত্মসাতের এ তথ্য উঠে এসেছে।

মো. খুরশীদ আলম ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেন। অনিয়মের অভিযোগের কারণে তাকে ওএসডি করে ঢাকায় এনে বেশ কিছুদিন মানবসম্পদ বিভাগে সংযুক্ত রাখা হয়। এরপর প্রথমে খুরশীদ আলমের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হয়। সেখানে অনিয়মের তথ্য উঠে এলে পরে প্রধান কার্যালয়ের একজন নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত হয়। উভয় তদন্তে একই রকম তথ্য পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর নিরীক্ষায়ও একই রকম তথ্য মিলেছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আলাদা একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতসব অনিয়ম উদ্ঘাটনের পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে রহস্যজনকভাবে সম্প্রতি তাকে সচিব বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেন্ডার আহ্বান এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মঞ্জুরি এড়াতে এক কাজকে একাধিকভাবে বিভক্ত করেন খুরশীদ আলম। নিজের অনুমোদিত ব্যয়সীমা ৫০ হাজার টাকার মধ্যে রেখে খণ্ড-খণ্ডভাবে কাজ করান তিনি। এভাবে মোট এক কোটি ২৯ লাখ টাকা কাজের ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্মাণকাজে ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৭৪১ টাকার ব্যয় থেকে সরাসরি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। আর আসবাবপত্র কেনায় ৪৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা খরচ দেখানো হলেও মাত্র ২৫ লাখ টাকার আসবাব কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৫৬০ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। তদন্ত দল মনে করে, প্রকৃত আত্মসাতের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। খুরশীদ আলমের সময়ে বা পরবর্তীকালে রংপুর অফিসে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আরও প্রায় ৭০ লাখ টাকার কাজ পরিদর্শন বা তদন্তের বাইরে রয়েছে। যার অন্তত অর্ধেকই আত্মসাৎ হয়েছে বলে তাদের ধারণা। ওইসব কাজের প্রায় ১৮ লাখ টাকার বিল এখনও অসমন্বিত রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া গভর্নর ও চারজন ডেপুটি গভর্নরের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভের মুখে মো. খুরশীদ আলম এবং অপর ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত বিএনপি সরকারের সময় থেকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যাংকের পুরোনো দখলদার ও অভিযুক্ত লুটপাটকারীরা যাতে পুনরায় ব্যাংকে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে দাবিতে গ্রাহকদের একটি অংশ ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। চলমান এ আন্দোলনের মুখে রোববার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা পরিচালনা পর্ষদের নির্ধারিত সভাও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মাসের ৩১ মে পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।

তবে নিজের পদত্যাগের খবর নাকচ করেছেন ওমর ফারুক খান। সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি পদত্যাগ করি নাই।” এর বেশি কিছু না বলেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

এর আগে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হলে তিনি গত বছরের ১৭ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *