গল্প: বিয়েতে প্রয়াত প্রেমিকের মা

✍︎ সোহেল আর রানা ✍︎

বিয়ের ছবি তোলার সময় আমি কখনো বর-কনের মুখের দিকে তাকাই না।

আমি তাকাই তাদের আশপাশের মানুষগুলোর দিকে। কে হাসতে হাসতে চোখ মুছছে, কে ছবি তোলার সময়ও ফোনে কথা বলছে, কে সবার সামনে আনন্দিত অথচ একটু পরপর একা হয়ে যাচ্ছে, এসব আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

বিয়ের ফটোগ্রাফি করতে করতে সতেরো বছরে একটা জিনিস শিখেছি। মানুষ সবচেয়ে বেশি কাঁদে সেই মুহূর্তে, যখন তাকে কাঁদার অনুমতি দেওয়া হয় না।

সেদিনও একটা বিয়ে ছিল। মিরপুরের একটা কমিউনিটি সেন্টারে। বরপক্ষ এসেছে গাজীপুর থেকে, কনেপক্ষের অধিকাংশ মানুষ ঢাকার। আলোকসজ্জা, ফুল, মঞ্চ, খাবার, সব মিলিয়ে বেশ বড় আয়োজন।

কনে মেহজাবিনের বয়স সাতাশ। বর একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, বিয়েটা নিয়ে তার কোনো অস্বস্তি নেই। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হাসছে, ছোটদের সঙ্গে ছবি তুলছে, মেকআপ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে বারবার চোখ মুছতে নিষেধ করছে সবাইকে।

শুধু একটা ব্যাপার আমার চোখে পড়ল।

মঞ্চের বাঁ দিকে, খাবারের টেবিলগুলোর পেছনে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন বয়স্ক এক মহিলা। পরনে ধূসর শাড়ি। মাথার চুলগুলো বেশির ভাগই সাদা। তাঁর হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগটা তিনি বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বসেছিলেন।

মহিলার সঙ্গে কেউ কথা বলছিল না। কেউ তাঁকে খাবারও দিতে আসেনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় হবেন। বিয়েবাড়িতে এমন মানুষ থাকেন, যাঁদের নাম বর-কনে দুজনের কেউই ঠিকমতো জানেন না।

“আসিফের মৃত্যুর পর অনেক দিন আমি ওদের বাসায় যাইনি। কীভাবে যাব? যে বাড়িতে গেলে আন্টি আমাকে দেখে বলতেন, আমার ছেলের বউ আসছে। সেই বাড়িতে আমি কী পরিচয়ে ঢুকব? একদিন সাহস করে গিয়েছিলাম। আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, তুমি আর আইসো না, মা।”

কিছুক্ষণ পর মেহজাবিন মঞ্চ থেকে নেমে সোজা তাঁর কাছে গেল।

আমি ক্যামেরা নিয়ে পেছন পেছন গেলাম। ভেবেছিলাম, একটা সুন্দর আবেগের ছবি পাব।

মেহজাবিন মহিলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

“আন্টি, খেয়েছেন?”

মহিলা মাথা নাড়লেন।

“তোমার বিয়ে দেখি, তারপর খাব।”

“বিয়ে তো হয়ে যাচ্ছে। এবার খান।”

মহিলা হাসলেন। তাঁর হাসিতে দাঁত কম দেখা গেল, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল।

“তুমি যাও। সবাই তোমারে খুঁজতেছে।”

মেহজাবিন উঠে দাঁড়াল না। সে মহিলার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল।

আমি ক্যামেরা তুললাম। ঠিক তখনই মেহজাবিন মুখ তুলে আমাকে বলল,

“ভাইয়া, এই ছবিটা তুলবেন না, প্লিজ।”

আমি ক্যামেরা নামিয়ে ফেললাম।

কেন বলল, জিজ্ঞেস করিনি।

রাত সাড়ে দশটার দিকে বর-কনের বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

মেহজাবিনের মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। বাবা বারবার চোখ মুছছিলেন, অথচ পরিচিত কেউ কাছে এলেই হাসার চেষ্টা করছিলেন। বান্ধবীরা ঘিরে ধরে ছবি তুলছিল। কেউ বলছিল, ফোন করিস। কেউ বলছিল, আমাদের ভুলে যাস না।

সবাই মেহজাবিনকে কোথাও না কোথাও ধরে রাখতে চাইছিল।

শুধু ধূসর শাড়ির মহিলাটি চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন। কাউকে কিছু না বলে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম।

লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট একটা প্যাকেট বের করলেন। সাদা কাগজে মোড়ানো। প্যাকেটটা একবার খুলে দেখলেন, আবার যত্ন করে গুছিয়ে রাখলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“আপনি কি কনের আত্মীয়?”

মহিলা আমার দিকে তাকালেন। চোখে ক্লান্তি, মুখে মৃদু হাসি।

“আত্মীয় না।”

“তাহলে?”

তিনি উত্তর দিলেন না।

লিফট এসে গেল। দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে বললেন,

“বাবা, বিয়ের ছবি তুললে মানুষগুলারে একটু ভালো কইরা তুলবা। বিয়ের পরে ছবিগুলা অনেক দিন থাকে। মানুষ সব সময় থাকে না।”

আমি তাঁকে আর আটকাতে পারিনি।

পরদিন দুপুরে মেহজাবিন ফোন করল।

“ভাইয়া, কাল যে বয়স্ক মহিলাটা এসেছিলেন, উনার কোনো ছবি উঠেছে?”

আমি বললাম,

“আপনিই তো নিষেধ করলেন।”

মেহজাবিন বললো,

“তবুও।”

আমি ল্যাপটপে ছবিগুলো খুললাম। একটা ছবিতে মঞ্চের কোণে তাঁকে দেখা যাচ্ছে। অস্পষ্ট, কিন্তু চেনা যায়।

“একটা উঠেছে। আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

মেহজাবিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল-

“উনি আমার প্রাক্তন প্রেমিকের মা।”

আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

“আমার প্রাক্তন প্রেমিকের নাম আসিফ। আমাদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। প্রথম দিন ওদের বাসায় গিয়ে আমি এতটা অস্বস্তিতে ছিলাম যে ঠিকমতো খেতেও পারিনি। আন্টি নিজের হাতে ভাত মেখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমার ছেলে তো সারাক্ষণ বাইরে থাকে। তুমি এলে আমার একটু কথা বলার মানুষ হয়।”

মেহজাবিন হেসে ফেলল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।

“তারপর থেকে আমি ওদের বাসায় গেলে আন্টি আমার পছন্দের খাবার রান্না করতেন। আসিফের সঙ্গে ঝগড়া হলে আন্টির কাছে নালিশ করতাম। আন্টি ছেলেকে বকতেন। পরে আসিফ ফোন করে বলত, তুমি আমার মাকে নিজের দলে নিয়ে নিলে?”

আমি শুনছিলাম।

“আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দুই পরিবারেও কথা হয়েছিল। তারপর একদিন আসিফ অফিস থেকে ফেরার পথে স্ট্রোক করল।”

শেষ কথাটা সে এমনভাবে বলল, যেন খুব সাধারণ কোনো খবর দিচ্ছে।

আমি কিছু বলতে পারলাম না।

“আমার প্রাক্তন প্রেমিকের নাম আসিফ। আমাদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। প্রথম দিন ওদের বাসায় গিয়ে আমি এতটা অস্বস্তিতে ছিলাম যে ঠিকমতো খেতেও পারিনি। আন্টি নিজের হাতে ভাত মেখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমার ছেলে তো সারাক্ষণ বাইরে থাকে। তুমি এলে আমার একটু কথা বলার মানুষ হয়।”

“আসিফের মৃত্যুর পর অনেক দিন আমি ওদের বাসায় যাইনি। কীভাবে যাব? যে বাড়িতে গেলে আন্টি আমাকে দেখে বলতেন, আমার ছেলের বউ আসছে। সেই বাড়িতে আমি কী পরিচয়ে ঢুকব? একদিন সাহস করে গিয়েছিলাম। আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, তুমি আর আইসো না, মা।”

মেহজাবিন থামল।

“বিয়ের কয়েক দিন আগে আন্টির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে দেখে বললেন, তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনলাম। আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ভালো থাইকো, মা।”

আমি চুপ করে রইলাম।

“আমি উনাকে বিয়েতে আসতে বলেছিলাম। জানি না কেন। হয়তো মনে হয়েছিল, আসিফের জীবনের একটা অংশকে বাদ দিয়ে আমি নতুন জীবন শুরু করতে পারব না। আবার হয়তো নিজের অজান্তেই চেয়েছিলাম, আমার বিয়েতে আসিফের পরিবারের কেউ থাকুক।”

“আমার প্রাক্তন প্রেমিকের নাম আসিফ। আমাদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। প্রথম দিন ওদের বাসায় গিয়ে আমি এতটা অস্বস্তিতে ছিলাম যে ঠিকমতো খেতেও পারিনি। আন্টি নিজের হাতে ভাত মেখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমার ছেলে তো সারাক্ষণ বাইরে থাকে। তুমি এলে আমার একটু কথা বলার মানুষ হয়।”

মেহজাবিনের গলা এবার খুব নিচু।

“কাল যখন উনি এসে ঐ চেয়ারটায় বসেছিলেন, আমার খুব ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে উনাকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু আমার চারপাশে এত মানুষ, এত প্রশ্ন, এত আয়োজন। আমি পারিনি।”

ওপাশে কান্নার শব্দ শুনলাম।

আমি কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না।

কল কেটে গেল।

তিন দিন পর আবার কল এল।

মেহজাবিন কাঁদছিল।

”ভাইয়া, আপনি কি আমার সঙ্গে একবার যাবেন?”

“কোথায়?”

“আন্টি মারা গেছেন।”

জানি না কেন, আমি সেই ছবিটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। একজন ধূসর শাড়ির মহিলা, বিয়ের মঞ্চের কোণে বসে আছেন, হাতে ছোট্ট প্যাকেট।

আমরা বিকেলে জানাজায় গেলাম। ছোট্ট উঠানে কয়েকজন প্রতিবেশী, দু-একজন আত্মীয়। মেহজাবিন এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ তাকে আলাদা করে প্রশ্ন করেনি, কেউ জানতে চায়নি সে কী পরিচয়ে এসেছে।

দাফনের পর সবাই যখন চলে যাচ্ছিল, মেহজাবিন তখনও কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

আমি কাছে গিয়ে বললাম,

”চলুন।”

সে মাথা নাড়ল।

“আরেকটু থাকি, ভাইয়া।”

আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর সে কবরের মাটি ছুঁয়ে খুব আস্তে বলল-

“আন্টি, ভালো থাকবেন।”

তারপর আর কোনো কথা বলল না।

আমি জানি না, মৃত মানুষ কিছু শুনতে পান কি না। কিন্তু সেদিন মেহজাবিনের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, সে এমন একজনকে বিদায় দিচ্ছে, যাঁর কাছে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি এতদিন বেঁচে ছিল।

ছয় মাস পর মেহজাবিন আমাকে তার বাসায় ডাকল।

বসার ঘরের দেয়ালে বিয়ের বড় ছবিটা টাঙানো। সে আর তার স্বামী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের মুখে হাসি। ছবিটার ঠিক নিচে ছোট্ট একটা ফ্রেমে ধূসর শাড়ির সেই মহিলা।

আমি ছবিটা দেখে অবাক হয়ে বললাম,

“এটা এখানে রেখেছেন?”

মেহজাবিন হাসল।

“আমার স্বামীই টাঙিয়ে দিয়েছেন।”

আমি কিছু বললাম না।

সে বলল,

“জানেন, ভাইয়া, আমার স্বামী একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কি এখনও আসিফকে ভালোবাসো?”

আমি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম।

মেহজাবিন নির্বিকার গলায় বলল,

“আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমাকেও ভালোবাসি। এই দুই ভালোবাসা এক রকম না। একটার সঙ্গে আমার একটা জীবন শেষ হয়ে গেছে, আরেকটার সঙ্গে আমি নতুন জীবন শুরু করেছি।”

সে দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকাল।

”আমার স্বামী অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, তাহলে আসিফের মাকে তোমার মায়ের মতোই দেখো। উনি তো আর কাউকে পাননি।”

মেহজাবিনের চোখ ভিজে উঠল।

আমি উঠে দাঁড়ানোর সময় ছবিটার কাছে গেলাম। ধূসর শাড়ির মহিলার চোখে সেই একই শান্ত দৃষ্টি। বিয়ের মঞ্চের কোণে বসে আছেন, হাতে ছোট্ট প্যাকেট।

আমি ছবিটা অনেকবার দেখেছি। কিন্তু সেদিন প্রথম মনে হলো, তিনি আসলে মেহজাবিনের বিয়েতে শুধু ছেলের প্রেমিকাকে দেখতে যাননি। তিনি গিয়েছিলেন নিজের ছেলের হয়ে শেষবারের মতো উপস্থিত থাকতে।

যে বিয়েতে তাঁর ছেলের থাকার কথা ছিল, সেখানে ছেলের মা এসে বসেছিলেন। ছেলের জায়গায় নয়, একটা কোণে। কাউকে বিরক্ত না করে, কোনো দাবি না জানিয়ে।

আমি আজও ছবিটা মুছে ফেলিনি।

মাঝে মাঝে খুলে দেখি।

আর মনে মনে ভাবি, পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় মানুষ হয়তো সেই মা, যিনি জানেন তাঁর ছেলে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না, তবু ছেলের ভালোবাসার মানুষটার বিয়েতে গিয়ে একবার দেখে আসেন, মেয়েটা ভালো আছে কি না।

কারণ, তাঁর নিজের ছেলে আর কোনো দিন এসে জিজ্ঞেস করবে না,

“মা, মেহজাবিন কেমন আছে?”

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *