✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
আন্তর্জাতিক ফুটবলে থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। এক খোলাচিঠিতে বিদায়ের কথা জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী এই ফুটবলার।
তাঁর স্প্যানিশ ভাষায় লেখা পোস্টটির বাংলা অনুবাদ হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
‘ফাইনালের পর এতটা সময় পেরিয়ে গেছে। অনেক ভেবেচিন্তে আজ আমি সবাইকে জানাতে চাই—জাতীয় দল থেকে আমি অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সিদ্ধান্তটা নিতে গিয়ে ভীষণ কষ্ট হয়েছে, এখনো বুকের ভেতর ব্যথা করে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সেই সময়। আমি শপথ করে বলতে পারি, সব সময়ই নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নয়, তারও আগে থেকে। এই জার্সির জন্য, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, ফুটবলের মাধ্যমে যেন আপনারা নিজেদের আর্জেন্টাইন পরিচয় নিয়ে গর্ব বোধ করেন—সেই লক্ষ্যেই সব সময় লড়েছি এবং নিজেকে নিংড়ে দিয়েছি।
সময় ফুরিয়ে আসছে, একে একে জীবনের অধ্যায়গুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর এই অধ্যায় বন্ধ করার সিদ্ধান্তটা আমার জন্য ভীষণ কষ্টের। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে আমি ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং সারা জীবন ভালোবেসেই যাব। নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছি। এখন আর দেওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই। এ ছাড়া, আমার পেছনে অসাধারণ সব তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে—তাদেরও জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্যতা আছে।
গত ২০ বছর ধরে আপনারা যে ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়েছেন, তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতর থেকে আপনাদের কণ্ঠ শুনতে ভীষণ মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদেরই একজন—বাইরে থেকে সব সময় দলকে সমর্থন করব ও পাশে থাকব। ভালো সময়ে যেমন, খারাপ সময়ে তো আরও বেশি।
আমার পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা—সব সময় পাশে থাকার জন্য, এই অসাধারণ অথচ কঠিন যাত্রায় আমার সঙ্গী হওয়ার জন্য। যেসব কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তার সঙ্গে পথ চলার সুযোগ হয়েছে, প্রত্যেককে ধন্যবাদ। আপনাদের সবার সঙ্গে কাটানো স্মৃতি ও মুহূর্তগুলো আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াব—এগুলো আমার জীবনের অমূল্য অর্জন।
আমার মনে এখন একটাই শান্তি ও গর্ব—সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আপনাদের এমন কিছু স্বপ্নের মুহূর্ত উপহার দিতে পেরেছি, যেগুলো আমরা নিজেরাও হয়তো কখনো কল্পনা করিনি। আপনাদের সঙ্গে সেসব মুহূর্ত বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা ছিল অবিশ্বাস্য, এককথায় পাগল করা সুন্দর।
আমি আপনাদের ভালোবাসি!
আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ার জন্য, হে ঈশ্বর, তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা।’
সর্বশেষ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি খেলেছেন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালে। নিউজার্সিতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর অঝোরে কেঁদেছিলেন তিনি। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে ধ্রুপদী ফাইনালে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর জিতেছিল বিশ্বকাপ। মেসিরও পূর্ণ হয় আজন্ম লালিত স্বপ্ন। তবে এবার আর্জেন্টিনা টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের কাছাকাছি এসেও জিততে পারল না।
এর আগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে একবার অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর হতাশায় আর্জেন্টিনাকে বিদায় বলেছিলেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর। কিন্তু এবার তাঁর বয়স হয়েছে ৩৯ বছর। ২০১৬ সালের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করেছেন মেসি, গোল বানিয়েছেন ৬৮টি। দেশটির জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা তো বটেই, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও গোল করায় এগিয়ে শুধু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এই পথ পর্যন্ত এসে মেসি মনে করেন, আকাশি–সাদা জার্সিতে তাঁর আর কিছু দেওয়ার নেই। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার তরুণ খেলোয়াড়দের জন্যও জায়গা ছাড়তে চান।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয়েছিল মেসির। এরপর দুই দশকের যাত্রায় দেশকে জিতিয়েছেন ২০২২ বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে না পারলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবেই শেষ হচ্ছে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়।
একসময় যে জার্সিতে বড় শিরোপা না জেতার আক্ষেপ ছিল তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা, সেই জার্সিই শেষ পর্যন্ত তাকে দিয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে অমর এক অধ্যায়। এবার সত্যিই সেই আকাশি-সাদা জার্সিকে বিদায় বললেন লিওনেল মেসি।
