বনশ্রীতে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে বলাৎকার, সমকামী কিশোর গ্রেফতার

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় একটি মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা ধর্ষণ ও আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় সমকামী শিহাব হোসেনকে (১৯) পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুজ্জামান মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন।

প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই আবুল কালাম আজাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তাঁকে গতকাল বুধবার রাতে পাবনার বেড়া উপজেলা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসা থেকে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ সুরতহাল শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

ঘটনার পর পুলিশের তদন্তে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শিহাব হোসেনের নাম উঠে আসে। পরে গতকাল শিশুটির মা রামপুরা থানায় ধর্ষণ ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) এর ৯(১) ধারা এবং পেনাল কোডের ৩০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আত্মহত্যার আগেই শিহাব হোসেন মাদরাসা ত্যাগ করে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। পরে রামপুরা থানার একটি আভিযানিক দল পাবনা জেলার বেড়া থানার খাকছাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।

ডিসি আরও বলেন, পাবনা থেকে গ্রেফতার হওয়া শিহাব ওই মাদরাসারই শিক্ষার্থী। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে-একটি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি শিশু আব্দুল্লাহর পরিবারের পক্ষ থেকে। তার বিরুদ্ধে একাধিক বলাৎকারের অভিযোগ রয়েছে। একটি মামলায় আব্দুল্লাহকে বলাৎকার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। অপর মামলাটি দায়ের করা হয়েছে মাদরাসার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে।

মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় পায়ুপথে অস্বাভাবিক যৌনাচারের আলামত পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিহাবের বিরুদ্ধে আগেও প্রতিষ্ঠানের চার শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ছিল। পুলিশের পরামর্শে মঙ্গলবার ওই ঘটনাগুলো নিয়েও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ রামপুরা থানায় একটি মামলা করেছে। তিনি আরও বলেন, শিশুটির লাশ উদ্ধারের আগেই শিহাব মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। পরে সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

আজ সকালে আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার এসআই সাইফুল ইসলাম।

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের ঘটনা দেশের জন্য লজ্জাজনক। মাদ্রাসায় পরপর এমন ঘটনা ঘটছে, যা সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তবে শুনানিতে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। পরে আদালত শিহাব হোসেনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

গতকাল বনশ্রীর একটি মাদ্রাসার শৌচাগার থেকে শিশু আব্দুল্লাহর (১০) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে বনশ্রী এলাকার একটি মাদ্রাসার তৃতীয় তলা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে শিশুটির মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক দীপিকা ঘোষ।

মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক বলেন, মাদ্রাসাটি যখন উদ্বোধন করা হয়, এই শিশু ছিল প্রথম শিক্ষার্থী। মাদ্রাসায় থেকে হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করত সে। মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পর সে শৌচাগারে যায়। অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও বের না হওয়ায় শিক্ষকেরা শৌচাগারের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখেন, গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় রয়েছে সে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে জানান। এরপর থানা থেকে পুলিশ এসে মরদেহ নামায়।

শিশুটির পায়ুপথে জখমের চিহ্ন রয়েছে, তাকে ধর্ষণ করা হয়ে থাকতে পারে পুলিশের এমন ধারণার বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক বলেন, মাদ্রাসায় তিনিসহ পাঁচজন শিক্ষক, দুজন স্টাফ এবং ৫৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে কেউই তেমন কিছু বলতে পারেনি। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী এক শিক্ষার্থীর (১৭) বিরুদ্ধে কিছু কথা জানিয়েছে, যেগুলো সন্দেহজনক। তবে মঙ্গলবার বিকেলে সে ছুটি নিয়ে মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। এর পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে বাড়িতেও যায়নি।

রামপুরা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতে ওই মাদ্রাসার তৃতীয় তলার শৌচাগার থেকে শিশুটির গামছা প্যাঁচানো ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে কোথাও কোনো জখমের চিহ্ন না থাকলেও পায়ুপথ অস্বাভাবিক। তাকে ধর্ষণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *