✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয় দিয়ে শেষ হলো জাতীয় দলের হয়ে মেসির ২১ বছরের পথচলা। বিদায়ী ম্যাচে নিজে একটি গোল করেছেন, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি।
৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করা গোলটি হয়ে থাকল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ গোল। শেষ বাঁশির পর সতীর্থরা যখন তাকে ঘিরে ধরলেন, তখন বুঝে নেওয়া গেল, সত্যিই শেষ হয়ে গেল একটি যুগ।
ম্যাচ শুরুর আগেই মনুমেন্টাল যেন রূপ নিয়েছিল উৎসবের মঞ্চে। এজেইজা থেকে স্টেডিয়ামে আসার পথে রাস্তার দুই পাশে সমর্থকদের ঢল। বাসের ভেতর থেকেই সেই দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি লিওনেল মেসি। চোখের পানি মুছতে মুছতে বাইরে থাকা সমর্থকদের দিকে হাত নেড়ে ভালোবাসার জবাব দিয়েছেন।
স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় সঙ্গে ছিলেন তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরো। মাঠে ওয়ার্ম-আপে এসে দুই হাত তুলে গ্যালারির প্রতিটি অংশকে অভিবাদন জানাতেই গর্জে ওঠে মনুমেন্টাল। এরপর ঘোষকের কণ্ঠে শেষবারের মতো শোনা গেল, ‘আমাদের অধিনায়ক, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, কিংবদন্তি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।’
জাতীয় সংগীতের সময় আবেগ আর লুকিয়ে রাখতে পারেননি তিনি। মেসির চোখে জল, একই দৃশ্য দেখা গেল কোচ লিওনেল স্কালোনির চোখেও। যে জার্সিতে ২১ বছর ধরে একটি জাতির স্বপ্ন বহন করেছেন, সেই জার্সিতে দাঁড়িয়ে শেষবার জাতীয় সংগীত গাইলেন তিনি।
বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল আর্জেন্টিনা। তবে প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি তারা। ৭ মিনিটে রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে বক্সের বাইরে মেসির শট ঠেকিয়ে দেন বেনিন গোলরক্ষক। ২৫ মিনিটে মেসির ফ্রি-কিকও রুখে দেন তিনি। ৩২ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের পাস থেকে পাওয়া সুযোগে মেসির শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
এর মধ্যেই আসে রাতের সবচেয়ে প্রতীকী মুহূর্ত। ম্যাচের ১০ মিনিটে রেফারি খেলা থামিয়ে দেন মেসিকে সম্মান জানাতে। ৮৫ হাজার দর্শক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যান। সতীর্থ, কোচিং স্টাফ, এমনকি বেনিনের খেলোয়াড়েরাও যোগ দেন করতালিতে। এক মিনিট ধরে শুধু মেসির জন্যই থেমে থাকে খেলা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে পাওয়া বলে ভলিতে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। মেসির মতো এই ম্যাচটিও ছিল ওতামেন্দির বিদায়ী ম্যাচ। গোলের কিছুক্ষণ পর তাকে তুলে নেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মাঠ ছাড়ার সময় পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় তাকে।
এরপর আবারও মেসির পাস থেকে গোল পায় আর্জেন্টিনা। বাঁ দিক থেকে মেসির বাড়ানো বল পেয়ে বক্সে ঘুরে বাঁকানো শটে বল জালে পাঠান নিকো পাজ। তার নিখুঁত শটে বেনিনের গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। বিদায়ী ম্যাচে এ নিয়ে দুটি গোলে সরাসরি অ্যাসিস্ট করলেন মেসি।
এরপর ৬৮ মিনিটে বেনিন বক্সে অগাস্টিন জিয়াই ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পটকিক থেকে ৭১ মিনিটে গোল করেন মেসি। তার শটে ডান দিকে ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি বেনিন গোলরক্ষক। জাতীয় দলের হয়ে এটি মেসির ১২৬তম গোল।
শেষ দিকে আরও গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। ৭৫ মিনিটে নিকো গঞ্জালেসের পাস থেকে পাওয়া সহজ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। ৮৯ মিনিটে বক্সের ভেতর থেকে তার বাঁ পায়ের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। যোগ করা সময়েও একটি ফ্রি-কিক পেয়েছিলেন মেসি, তবে সেটি জালে জড়ায়নি।
শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। এটাই ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ গোল এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এটা তার ১২৬তম গোল।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২০০৫ সালে অভিষেক। সেই ম্যাচেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাল কার্ড দেখে শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। এরপর ২১ বছরে কত উত্থান-পতন, কত সমালোচনা, কত হতাশা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়- সব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জয়।
বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে মুখ খুললেন মেসি
আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিদায়ী বক্তব্যে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের নানা অধ্যায় নিয়ে কথা বলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সেখানে উঠে আসে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের প্রসঙ্গও।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিল প্রত্যাশার তুলনায় নিষ্প্রভ। ১২০ মিনিটের ম্যাচে মেসিও ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। গোলের লক্ষ্যে কোনো শটও নিতে পারেননি তিনি। সেই ম্যাচের পর আর্জেন্টিনা শিবিরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
বিশেষ করে ম্যাচের পর ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে গুঞ্জন আরও বাড়ে। সেখানে মেসিকে ‘সবাই শান্ত হও’ বলতে শোনা যায়। এরপরই ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে পরে আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবার মেসিও বিদায়ী বক্তব্যে সেই সময়কার পরিস্থিতি পরিষ্কার করলেন।
মেসির দাবি, বিশ্বকাপের শেষদিকে দলের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপ ছিল। তার ভাষায়, ‘সর্বশেষ বিশ্বকাপে অনেক বড় ধকল গেছে। আমরা আবারও পুরো দেশের স্বপ্ন পূরণের খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম। স্বপ্নটা ছিল আবার বিশ্বকাপ জেতা। আমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খুব কাছে ছিলাম।’
বিশ্বকাপের শেষদিকে দলের ওপর জমে থাকা চাপের পেছনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটির প্রভাবও ছিল বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মেসি। তার মতে, সেই ম্যাচের চাপ সামলাতে গিয়ে দল মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেদের সীমার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
মেসি বলেন, ‘অদ্ভুত কিছু ঘটেনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচটা আমাদের জন্য ছিল প্রচণ্ড চাপের। বিশ্বকাপের পর অনেক তত্ত্ব আর নানা রকম গল্প ছড়িয়েছে। মানসিক ও শারীরিকভাবে আমরা সীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমাদের সব সতীর্থকে নিয়ে আমরা সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়েছি।’
শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি
বিদায়ী ম্যাচে মেসি বলেন, আমি শপথ করে বলছি, সারাজীবন এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই।’
পরক্ষণেই বলেছেন, ‘কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটাই সঠিক সময়। শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য অনেক বেশি কঠিন ছিল। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, খুব কাছেও গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা শারীরিক ও মানসিক, দুই দিক থেকেই আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন ছিল। সত্যি বলতে, আমরা কোনোমতে টিকে ছিলাম।’
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমার ভেতর দিয়ে আবেগের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিতভাবেই এমন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি যা আমি বলতে চেয়েছিলাম, কারণ এটা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন এক মুহূর্ত। সবার আগে যার কথা আমার মনে আসছে, তিনি হলেন আমার বাবা। এখানে খেলতে না পারাটা আমি খুব মিস করব। আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি এবং আমি একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত। আমি কৃতজ্ঞতা, গর্ব ও শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সির প্রতি ভালোবাসা জাতিয়ে বলেন, ‘এই জার্সিকে ধন্যবাদ। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে, এমনকি সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলোতেও আমি কখনও লড়াই করা থামাইনি। সামনে এগিয়ে যাওয়া বন্ধ করিনি, আমার যা কিছু ছিল তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি এবং সবসময় এখানে থাকতে চেয়েছি। এখানে আর আসা এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে না খেলতে পারাটা আমাকে অনেক বেশি কষ্ট দেবে। যদি আমার হাতে থাকত, তাহলে আমি আমার সারা জীবন এখানে খেলে যেতে চাইতাম। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাটাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আজ আমি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি, কারণ আমি স্রেফ চাই না যে এই মুহূর্তটি শেষ হয়ে যাক। কিন্তু আমার মনে হয়, এবার আমার অবসর নেওয়ার সময় চলে এসেছে। গত বিশ্বকাপে আমরা যা কিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তা আমাদের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমরা আমাদের শেষ শক্তিটুকু নিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিলাম কিন্তু আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছি, ঠিক যেভাবে আমরা সবসময় করে এসেছি। আমরা আবারও জেতার খুব কাছাকাছি ছিলাম এবং আমাদের নিয়ে যা কিছু বলা হয়েছিল, আসলে তেমন অদ্ভুত কিছুই ঘটেনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের অনেক শক্তি ক্ষয় করেছিল, কারণ আমরা সেখানে আমাদের একেবারে সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলাম।
মেসি বলেন, ‘২০২২ সালে, আমাদের কেবল আমার নিজের স্বপ্নই নয়, বরং পুরো একটি দেশের স্বপ্ন পূরণ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল- আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আর আমরা তা করে দেখিয়েছিলাম। আমরা বিশ্বকাপ জিতেছি, কোপা আমেরিকা জিতেছি, ফিনালিস্সিমা জিতেছি… এই জাতীয় দলের সঙ্গে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এর সবকিছুর জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। তবে এই যাত্রাটা কেবল ২০২২ বা এই শেষ বিশ্বকাপকে নিয়ে নয়। আমরা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনেক আগে থেকে অসংখ্য সতীর্থ এই জার্সির জন্য আমার পাশাপাশি লড়াই করেছে। তাদের প্রত্যেকে আর্জেন্টিনার জন্য কতটা লড়াই করেছে এবং নিজেদের কতটা উজাড় করে দিয়েছে, তা নিয়ে কখনো কোনো সন্দেহ করিনি ‘
মহাতারকা এই ফুটবলার বলেন, ‘আমার সব সতীর্থর সঙ্গে মাঠ ভাগাভাগি করতে পারা এবং ফুটবলের বাইরে আমাদের জীবনের এত বড় একটি অংশ এক সঙ্গে কাটাতে পারাটা ছিল একটি সৌভাগ্য ও সম্মানের। প্রতিবার যখন আমরা মাঠে পা রেখেছি, আমি জানতাম আমরা যে কোনো দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি। কারণ, আমার পাশে এমন সব যোদ্ধা ছিল যারা মাঠে তাদের সবটুকু দিতে প্রস্তুত ছিল। সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো লুফে নিতে হলে আপনার একটি শক্তিশালী দলের প্রয়োজন। আর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতেই আপনি সত্যিই আবিষ্কার করতে পারবেন যে, আপনার দলটি কেমন। এটাই অন্যতম বড় কারণ, যার জন্য আমরা যা কিছু অর্জন করেছি, তা করতে পেরেছিলাম। বিশেষ করে এই দলকে ধন্যবাদ। তারা আমাকে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। তারা আমাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেছে। আমি জনগণকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই। আর্জেন্টিনার অনেক শহরে খেলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এবং আমি যেখানেই গিয়েছি, অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসা পেয়েছি ‘
লড়াকু এই ফুটবলার আরও বলেন, এই এত বছর ধরে, পৃথিবীর যেখানেই আমরা খেলি, স্টেডিয়ামগুলো সবসময় আর্জেন্টাইনদের দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। ম্যাচ যেমনই হোক কিংবা দূরত্ব যতই হোক না কেন, মানুষ সেখানে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে। আমরা জানি সেটা কতটা কঠিন। পৃথিবীর যেখানেই আমরা গিয়েছি, মনে হয়েছে আমরা নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি, কারণ আমরা সবসময় আপনাদের সমর্থন অনুভব করতে পেরেছি। এই সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। কঠিন মুহূর্ত আসবে, আর সেই মুহূর্তগুলোতেই দলকে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সমর্থন করতে হবে। আপনাদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দলের প্রয়োজন, কারণ সবসময় এমন কিছু মানুষ থাকবে, যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায় এবং আমরা তাদের সেই আত্মতৃপ্তির সুযোগ দিতে পারি না। এখানে, এই স্টেডিয়ামে, আমি আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের একটি দিন পার করেছি–বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ঘরের মাঠে খেলা আমাদের প্রথম ম্যাচটি। সেটি ছিল খুব সুন্দর। আর আজকের দিনটি হয়ত সবচেয়ে দুঃখের দিনগুলোর একটি, কারণ আমি এখানে দাঁড়িয়ে বিদায় নিচ্ছি। আমি আপনাদের সবাইকে খুব মিস করব, কিন্তু আমি সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। আমি এই ছেলেদের এবং এরপর যারা আসবে, তাদের সবাইকে সমর্থন করে যাব।
বিদায়ী ম্যাচে প্রতীকী হলুদ ও লাল কার্ড পেলেন মেসি
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিলেন রেফারি ফার্নান্দো ভেখার। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর শেষ বাঁশি বাজিয়ে মেসির কাছে এগিয়ে যান তিনি। এরপর আর্জেন্টাইন অধিনায়কের হাতে তুলে দেন হলুদ ও লাল কার্ডের একটি সেট।
অবশ্য এগুলো কোনো শাস্তির কার্ড ছিল না। আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের অপরাধের জন্য যে হলুদ ও লাল কার্ড ব্যবহার করা হয়, বিদায়ী ম্যাচের স্মারক হিসেবে সেই কার্ড দুটির একটি বিশেষ সেটই মেসিকে উপহার দেন ভেখার। মেসিও সেগুলো স্মৃতি হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেন।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পুরো মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের আলো ছিল মেসিকে ঘিরে। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে এমন উপহার দিয়ে তার বিদায়কে আরও বিশেষ করে তুললেন ম্যাচের রেফারি।
মেসির বিদায়ী ভাষণে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এনজো
লিওনেল মেসির বিদায়ী মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না এনজো ফার্নান্দেজ। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক যখন মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন এনজো। মেসির বিদায়ের সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
মেসির সঙ্গে এনজোর সম্পর্কটা শুধু সতীর্থের নয়, বরং এক প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের গল্পও। ২০১৬ সালে মেসি যখন জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন এনজো ছিলেন মাত্র ১৫ বছরের কিশোর। তখনই নিজের আইডলকে সিদ্ধান্ত বদলের অনুরোধ জানিয়ে আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন তিনি।
সেই চিঠিতে এনজো লিখেছিলেন, ‘আপনি যখন বলেছিলেন যে চলে যাচ্ছেন, আমার বড্ড কষ্ট হয়েছিল। তখন আমি ছোট ছিলাম, আর মনে মনে হিসেব কষছিলাম আপনার বয়স আর আমার বয়সের পার্থক্য নিয়ে, কোনোদিন আপনার সঙ্গে ফুটবল মাঠে নামার সুযোগ পাব কি না!’
সময়ের সঙ্গে সেই কিশোরই একদিন মেসির সতীর্থ হয়েছেন, একই জার্সিতে বিশ্বকাপ জিতেছেন। তাই মেসির বিদায়ের মুহূর্তটি এনজোর জন্য ছিল আরও বেশি আবেগের।
মেসির ফুটবলীয় প্রতিভার পাশাপাশি তার ব্যক্তিত্ব ও মানবিক ব্যবহারের কথাও স্মরণ করেছেন এনজো। তিনি বলেন, ‘আমি আসার পর থেকে আপনি আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন, তার জন্য আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।’
মেসির সঙ্গে একই মাঠে খেলার স্বপ্ন নিয়ে জাতীয় দলে এসেছিলেন এনজো। কিন্তু মেসির কাছ থেকে শুধু মাঠের অভিজ্ঞতাই নয়, পেয়েছেন আপন করে নেওয়ার অনুভূতিও। এনজোর ভাষায়, ‘আমি এখানে এসেছিলাম আমার আইডলের সঙ্গে মাঠ ভাগ করে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তার বদলে আমি এমন একজনকে পেয়েছি, যিনি প্রথম মুহূর্ত থেকেই আমাকে এই দলেরই একজন হিসেবে অনুভব করিয়েছেন।’
শেষে নিজের ছোটবেলার সেই স্বপ্নের কথা মনে করিয়ে এনজো মেসিকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আমি কত ভাগ্যবান ছিলাম, লিও! সেই ছোট বাচ্চাটা যে হিসেব কষছিল, কত ভাগ্যবান ছিল সে! আমার সঙ্গে এই আচরণ করার জন্য, আমাকে সবকিছু শেখানোর জন্য এবং আপনার গল্পের একটি অংশ আমাকে হতে দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
মেসির জাতীয় দলের বিদায়ের রাতে তাই আর্জেন্টিনার জয়ের পাশাপাশি আলাদা করে মনে থাকবে এনজোর কান্নাও। যে কিশোর একসময় টেলিভিশনের পর্দায় নিজের আইডলকে দেখতেন, সেই এনজোই আজ তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলেন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।
