✍︎ লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি ✍︎
লক্ষ্মীপুরে একটি মারামারি মামলায় ফারহানা আক্তার শিল্পীসহ দুইজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। শিল্পীর সঙ্গে তার দেড় বছরের শিশু সিয়ামকেও কারাগারে যেতে হয়েছে। এদিকে, স্কুলড্রেস পরিহিত তার আরও দুই সন্তান মায়ের জন্য জেলগেটে দাঁড়িয়ে ছিল।
সোমবার (১১ মে) দুপুরে লক্ষ্মীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতের (সদর) বিচারক শাহ জামাল এ নির্দেশ দেন। বিকেলের দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন আদালতের পেশকার দেলোয়ার হোসেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন জানান, সিআর ৫৬৫ মামলায় শিল্পী ও জহির উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শিল্পীর সঙ্গে তার দুগ্ধপোষ্য শিশু সিয়ামও এখন কারাগারে। অন্যদিকে তার অন্য দুই সন্তান শহীদ স্মৃতি আদর্শ একাডেমির পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র শিপন হোসেন (১০) ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী তামান্না আক্তার (৮) জেলগেটে মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদের বর্তমানে পরীক্ষা চলছে।
আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও ও ছবি পোস্ট করে দাবি করেন, শিল্পীর বিরুদ্ধে লোহার রড দিয়ে আঘাত করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে উল্টো শিল্পী নিজেই হামলার শিকার হচ্ছেন।
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী রাকিবুল হাসান তামিম বলেন, ‘এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে শিল্পী রড দিয়ে বাদীর মাথায় আঘাত করায় মগজ বের হয়ে গেছে। কিন্তু আদালতের তলবকৃত মেডিকেল সার্টিফিকেটে (এমসি) চিকিৎসকরা একে ‘সাধারণ জখম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আদালত শিল্পীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।’
লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নূর মোহাম্মদ সোহেল জানিয়েছেন, বিকেলে ওই নারীকে কারাগারে আনা হয়েছে। তার সঙ্গে ছোট শিশু সিয়ামও রয়েছে।
সোমবার বিকেল ৫টার দিকে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত সদরের পেশকার দেলোয়ার হেসেন বলেন, সিআর ৫৬৫ মামলায় আসামি শিল্পী ও জহির উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুপুরে আদালতের বিচারক শাহ জামাল এ নির্দেশ দেন।আমরা আসামিদের আদালতের পুলিশ হাজতে দিয়েছি। পরে বাচ্চাকে কারাগারে নিয়েছে নাকি বাসায় নেওয়া হয়েছে তা জানি না।
আসামি শিল্পীর ভাই মো. ইউসুফ বলেন, সাজানো একটি মামলায় দুধের শিশু নিয়ে আমার বোনকে কারাগারে যেতে হয়েছে। তার আরও দুই শিশু মায়ের জন্য কান্না করছে। শিশু শিপন ৫ শ্রেণীতে পড়ে, তামান্না ৩য় শ্রেণীতে। আজকে (সোমবার) তাদের বাংলা বিষয়ের পরীক্ষা ছিল, আগামীকাল (মঙ্গলবার) ইংরেজি পরীক্ষা। মা ছাড়া এ দুই শিশু কীভাবে পরীক্ষার টেবিলে বসবে?
এজাহার সূত্র জানায়, মামলার বাদী মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের সাহাপুর এলাকার মৃত ছিদ্দিক উল্যাহ ভূঁইয়ার ছেলে। ১৫ এপ্রিল তার ওপর হামলার অভিযোগ এনে তিনি অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী সদর আদালতে মামলা দায়ের করেন। এতে প্রতিবেশী শিল্পীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৫ জনকে আসামি করা হয়। শিল্পী পৌরসভার সাহাপুর এলাকার ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী। মামলায় উল্লেখ করা হয় শিল্পী রড দিয়ে বাদীর মাথার পেছনে আঘাত করে। এতে বাদীর মাথার হাড় ভেঙে মগজ বের হয়ে যায়। অন্যদিকে এজাহারে গুরুতর আঘাত উল্লেখ করা হলেও লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটে (এমসি) আঘাতের ধরণ সিম্পল (সাধারণ) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মামলার বাদী মাহতাব ও তার ভাই আফতাবের সঙ্গে ইসমাইল হোসেনের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এপ্রিল মাসে মারামারির ঘটনা ঘটে। সে সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় বাদী মাহতাবের ভাই সাবেক শিবির নেতা আফতাব উদ্দিন শিল্পীসহ নারীদের বেদমভাবে মারধর করছে। পরবর্তী সময়ে শিল্পীর স্বামীর মামলায় পুলিশ আফতাবকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়। এই মামলা থেকে রক্ষা পেতে তারা আদালতে কাউন্টার মামলা করলে আদালত মামলাটি আমলে নেন।
শিল্পীর জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জজ আদালতের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম দীপু জানান, আজ আদালতে শিল্পীর জামিনের আবেদন করা হয়নি। বিধিমোতাবেক ৭ দিন পরে আবারও জামিনের আবেদন করা যাবে।
কারাফটকে মায়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা শিশু শিপন ও তামান্না তাদের স্বজনদের কাছে নিরাপদে থাকলেও সারাক্ষণ মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে।
